ই কমার্স: যে ভুলগুলো উদোক্তাদের লক্ষ্য অর্জনে বাঁধা, জাহাঙ্গীর আলম শোভন

1531

ই কমার্স: যে ভুলগুলো উদোক্তাদের লক্ষ্য অর্জনে বাঁধা
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আজ থেকে ১৫ বছর আগে বাংলাদেশে ই কমার্সের সূচনা হলেও আজ অবধি তা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর কথা ছিলো। তা হয়নি। এমনকি স্বাভাবিক একটা গতিও এ ব্যবসায় আসেনি। অথচ প্রায় ২ শতাধিক ই কমার্স সাইট রয়েছে। এর মধ্যে শ খানিক প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন ব্যবসায়ের ই কমার্স ভার্সণ।শুধু ই কমার্স বললে ভুল হবে। বাংলাদেশে এখনো অনেক ব্যবসা ও পেশা রয়েছে এগুলোর চাহিদা যেমন রয়েছে তেমনি কাজও করছেন অনেকে। কিন্তু সেগুলো পেশাদারিত্বের একটা অবস্থানে এসে এখনো পৌছেনি।উদাহরণ দিতে গেলে দিয়ে শেষ করা যাবেনা। কোনো পেশাকে খাটো করার উদ্দেশ্য আমার নেই। তবুও আপনাদের অনুধাবনের জন্য বলি। এখনো হাতে গোনা কয়েকটা পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল ছাড়া বাদবাকী বেশীরভাগ সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের প্রতিটি মাস নুতন অনিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হয়। অথচ আমরা কথায় কথায় বলি আমাদের মিডিয়া অনেক অগ্রসর। রিয়েল স্টেট সেক্টর আমার জানামতে বাংলাদেশের সবচে দ্রুত বর্ধিত একটা খাত। শীর্ষস্থানীয় কয়েকটা কোম্পানী এবং আরো কিছু কোম্পানী আছে যাদের নিজস্ব কাস্টমার আছে তারা ছাড়া বাকীদের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। আমরা জানি যে এই সেক্টরে প্রাইভেটে সবচে বেশী বিনিয়োগ হয়েছে। আর শ্রমজীবি মানুষেদের অবস্থা আরো বেশী খারাপ। একজন হোটেল শ্রমিক বা নির্মাণ শ্রমিক কাল কাজ বন্ধ করে দিলে তার এমন কোন সঞ্চয় থাকেনা যা দিয়ে সে কয়েকমাস চলবে।
সূতরাং হতাশ হওয়া কিছু নেই। আজকের অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশগুলোও একদিন এসব অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে আজ বেরিয়ে এসেছে। আমাদের সব ক্ষেত্রেই কিছু কমন ফ্যাক্টতো আছেই। আর আছে সাপোর্ট বিজনেসের জটিলতা, ব্যাংকলোন, মানুষের সচেতনতার অভাব আর প্রতারকদের প্রতারণা তো আছেই। তার উপর আছে নিজেদেরও নানা রকম সমস্যা। ই কমার্সের গতিটা ত্বরান্বিত না হওয়ার কারণ সম্পর্কে এখানে আজ একটু আলোকপাত করা যাক।

১. না জেনেই শুরু করা: ই কমার্সে ঘরে বসে ব্যবসা করা যায়, একথা শুনেই সকলে উৎসাহী হন, বিস্তারিত না জেনে অথবা ই কমার্স সম্পর্কে ভালো না বুঝে বা সমস্যা সম্ভাবনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হয়ে অনেকেই ওয়েবসাইট খুলে ব্যবসা শুরু করছেন। অথচ এর পূর্বে বাজার ও কাস্টর্মা সম্পর্কে তার যে একটা স্টাডি করা দরকার সেটা কেউ বুঝতে রাজী নয়। ফলে একটা পর্যায়ে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে অথবা ভালো ফল না পেয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে বসেন।

২. সিদ্ধান্তহীনতা: যারা ই কমার্স করতে আসছেন তাদের অনেকেই ব্যবসার অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। যেমন তার কাস্টমার কারা হবে? তিনি কোন পন্য সেল করবেন? কেন করবেন? কত লাভ করবেন? কত লাভ করা যক্তিযুক্ত? কত লাভ করলে মার্কেটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে? কোন এলাকা টার্গেট করবেন? তার প্রচার কৌশল কি হবে? কিভাবে পন্য গ্রাহকের হাতে যাবে? কিভাবে মূল্য পরিশোধ হবে? কিভাবে মান নির্ধারণ হবে? কিভাবে প্যাকিং ও পরিবহন হবে? এসব বিষয়ে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই ব্যবসা শুরু করেছেন। এ অবস্থায় ই কমার্সের সাগরে একজন দিশাহীন মাঝির মতো বৈঠা বাইলে গন্তব্যের দেখা পাওয়াতো কঠিন হবেই।

৩. দৃঢ়চিত্ত না হওয়া: আর একটা ব্যাপার হলো হেলাফেলা করা। অনেকেরই মনোভাব এরকম দেখিনা কি হয়? হলেতো হলো না হলে অন্য কিছু করবো। এই মনোভাবে কাজ করলে কখনোই ব্যবসা দাড়াবেনা। এটা আহসানিয়া মিশনের লটারির টিকিট নয় যে কিনে ফেলে রাখলাম। যদি লাইগা যায়। এখানে দৃড়চেতা হতে হবে। আমি ই কমার্স করবোই করবো অথবা ই কমার্স নিয়ে ব্যবসা করেই ছাড়বো। এতটুকু মনোভাব না হলেও চলবে অন্তত এটা মনে করুন যতদিন ই কমার্স নিয়ে কাজ করবো। ততোদিন ভালোভাবেই করবো। সফল হওয়ার জন্য যা যা দরকার সবই করবো। এতোটুকু মনোভাবে এবং কাজ আপনাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

৪. নানা রকম ভুল ধারণা: যেহেতু ই কমার্স মানেই ঘরে বসে ব্যবসা সূতরাং অনেকেই একটি সাইট বা প্জে খুলে বসে থাকেন তারা মনে করেন। পেইজ থেকে এমনি এমনি সব প্রোডক্টস বিক্রি হয়ে যাবে। ফলে তারা ব্যবসা উন্নয়নের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। আজ রকমারী ডটকমকে যদি আপনি দেখেন তারা কিন্তু পোস্টার আর রাস্তায় ব্যানার দিয়ে পরিচিতি পেয়েছে। যদিও ব্যবসাটা অনলাইনে। বিক্রয় ডটকম সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য তারা টিভিকে বেছে নিয়েছিলো। আপনার অতটা না হোক ফেইসবুক কিংবা আরো স্বল্প পরিসরেও প্রচারণা চালানো যায়। মোট কথা আপনার সাইট ও পন্যের খবর কাস্টমারকে জানাতে তো হবে।

৫. সিরিয়াস না হওয়া: আমার মনে হয় যারা এটাকে পার্ট টাইম বা টাইম পাসের কাজ মনে করেছেন তারা পিছিয়ে রয়েছেন। আর যারা সিরিয়াস হয়েছেন তারা এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনার ব্যবসা ঘরে বসে হবে এটা সত্য। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে ব্যবসাটা দাড়াবেনা। ব্যবসা দাড়ানোর হার্ট এন্ড সোল কাজ করতে হবে। সোজা কথায় লেগে থাকতে হবে। আপনি দেখুন একটা গ্রামীন ব্যাংকের পেছনে একজন ইউনূছের জীবনপন যুদ্ধ ছিলো। একটা ব্রাকের পেছনে একজন ফজলে হাসান আবেদেরে সারাজীবন চলে গিয়েছে। একটা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পেছনে নিবেদিত হয়েছেন একজন স্যার আবদুল্যাহ আবু সায়ীদ। একটা বসুন্ধরা গ্রুপ, একটা অটবি এর পেছনে একজন মানুষ তার জীবন যৌবন ক্ষয় করেছেন। এখন ব্যবসাগুলো দাড়িয়ে গেছে তারা শুধু এক জায়গায় বসে লক্ষ্য রাখছেন এর প্রতিটি অংগ সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা।

৬. ঐক্যবদ্ধ না হওয়া: বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প বিকাশের পেছনে ঐক্যবদ্ধ বিজেএমইএ এর বিশাল ভ’মিকার কথা সবার জানা। আমাদের এখানে সবাই নিজে নিজে পয়সাওয়ালা হতে চায়। এ ধরনের একটা মানষিকতার কারণে নিজে নিজে সব কারতে চায়। অথচ ঐক্যবদ্ধ প্রচেস্টা যেমন ব্যবসায়িক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে তেমনি একজনে বিপদ আপদে আরেকজন এগিয়ে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ প্রচেস্টার কারণে খরচ কমে যায়। উদাহরণ স্বরুপ কখনো দেখা যায় একই কাউন্টারে ১০টা বাসের টিকিট পাওয়া যায়। ১০টা বাস কোম্পানী মিলে একটা কাউন্টার করার মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের খরচ কিন্তু ১০ % কমে গেছে। আমরা জানি দেশী ১০টি ফ্যাশনহাউস এক হয়ে দেশীদশ নামে অভিন্ন আউটলেট প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে তাদের শুধু খরচ নয় ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক সমাগমে সহজ হয়েছে। আবার ক্রেতাদের জন্য এটা একটা উপকার, তারা একসাথে ১০টি ব্যান্ডকে পাচ্ছে।

৭. অন্যান্য: এছাড়া আরো কিছু ভুল ব্যক্তিবিশেষে করে থাকেন তাহলো অন্য কোম্পানীর বদনাম করা, অন্যকে হিংসা করা এবং কাস্টমারের চাহিদার ব্যাপারে গাফিলতি করা। আপনি প্রোড্ক্টস যে সময়ে পাঠানোর ওয়াদা করেছেন কোন কারণে দেরী হলে গ্রাহকে বিনয়ের সহিত সেটা জানানো উচিৎ। আবার অনেকেই জানেন না যে কুরিয়ার ও ট্রাস্পপোর্ট কোম্পানীগুলো কি পরিমাণ টানা হেছড়া করে মাল উঠা নামা করায়। ফলে দূর্বল প্যাকিং এর কারণে পন্য নষ্ট হয়। প্যাকিং মজবুত করার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। একটা তিক্ত আমাদের কুরিয়ার কোম্পানীর লোকেরা লো পেমেন্ট পায় বলে চাকুরীর প্রতি মায়াটা কম, ঠিক একই কারণে সেলোকটি আপনার পন্যের প্রতি দায়িত্বশীল নন, আামি সবার কথা বলছিনা। তবে অনেকেই এরকম হন এটা কারো দশ নয় এটা আমাদেও আর্থ সামাজিক অবস্থার একটা বাস্তবতা।

সূতরাং উপরের বিষয় সমূহ বিশ্লেষণ করে আমরা অতীতের ভুল সমূহ সমাধান করে যদি সামনে এগিয়ে যেতে পারি তাহলে সাফল্য অপেক্ষা করছে। কারণ বাজার এখনো ফাঁকা রয়েছে। এখনো কেহই একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। একনই সময় আপনার উঠে দাড়ানোর। আপনার যদি কাড়ি কাড়ি টাকা থাকে তাহলে একটা নিবেদিতপ্রাণ টিম গঠন করে এগিয়ে যান আর যদি তা না হয় তাহলে ১০ জনে মিলে কাজ ভাগাভাগি করে শুরু করুন। আপনাদের সাফল্য কামনা করছি।

জাহাঙ্গীর আলম শোভন, বিজনেস কনসালটেন্ট

Comments

comments

About The Author



Freelance Consultant, Writer and speaker . Jahangir Alam Shovon has been in Bangladeshi Business sector as a consultant, He has written near about 500 articles on e-commerce, tourism, folklore, social and economical development. He has finished his journey on foot from tetulia to teknaf in 46 days. Mr Shovon is social activist and trainer.

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *