লেনদেন ও পেমেন্ট গেটওয়ে
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আমাদের দেশে লেনদেনের ইতিহাস খুব পুরনো আবার বিস্তৃত লেনদেনর ইতিহাস শতাব্দীর প্রান্ত থেকে শুরু মাত্র। পৃথিবীর প্রথম অর্থশ্বাস্ত্র যাকে আমরা ‘‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’’ বলি তার জন্ম এই ভারতবর্ষে। কয়েক শতাব্দী পুরনো এখানকার ব্যবসা বানিজ্যের ইতিহাস। এখানকার অধিবাসীরা সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী বলে ধর্মীয় সামাজিক সংস্কারের বশে একসময় সমুদ্র পাড়ি দেয়া বারণ বলে মনে করতো সেজন্য এরা অন্যত্র গিয়ে বাণিজ্য না করলেও এতাদঞ্ছলের সৌয্য-বীর্যের কারণে মধ্যএশিয়া ও ইউরোপের বনিকরা এখানে এসে বানিজ্য করতো। বিনিময় প্রথার পাশাপাশি কড়ি ও সোনারুপার মতো মূল্যবান ধাতু বিনিময় হতো। পরে রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের সাথে সাথে মূদ্রা প্রচলন শুরু হয়। এখানকার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কিছুটা নকশা মেলে ‘‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে’’ আর আধুনিক অতীতের ভালো বিবরণ পাওয়া যায় ইবনে বতুতার ভ্রমন বৃত্তান্ত থেকে। এই সমৃদ্ধ জনপেদের লোকেরা নিজেরা নিজেদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদন করতো বিধায় খুব বেশী নগদ লেনদের প্রয়োজন হতোনা।
কিন্তু বিগত শতকে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে গেছে। এখন আমরা বৈদেশিক সাহায্য ও বৈদেশিক ঋণ নির্ভর। বৈদেশিক রেমিটেন্স আর দেশীয় বাজারের লেনদেনের কথা বলাই বাহুল্য। ১৬ কোটি মানুষের এই বাজারের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের যে বিকিকিনি তাও বিশাল আকারের বাজারের ব্যবস্থার সূচক নির্দেশ করে। তথাপি লেনদেনের উপায় ও মাধ্যমে গত অর্ধ শতকে বিপ্লাবাত্মক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সময় এবং সহজীকরনের দিক থেকে লেনদেন এসে গেছে ‘‘ ক্লিক’’ ব্যবস্থার অধীনে কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে আমরা পিছিয়ে আছি বৈকি। ব্যাংক ব্যবস্থার পাশাপাশি গত অর্ধযুগে ব্যাংক ব্যবস্থা নির্ভর তিনটা লেনদেন ব্যবস্থা অনলাইন ব্যবসার জগতেকে দশগুন এগিয়ে দিতে সাহায্য করেছে। এর একটি হলো অনলাইন ব্যাংকিং, একটি মোবাইল ব্যাংকিং অন্যটি কার্ডভিত্তিক লেনদেন ও পেমেন্ট গেটওয়ে।
অনলাইন ব্যাংকিং এর জন্য ব্যাংক একাউন্ট থাকা ও নির্দিষ্ট পক্রিয়া অনুসরনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এতে ব্যাংকের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে লেনদেন সম্পœœ করতে হয়। এর আবার বিস্তৃতির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফলে সবার জন্য এটা সহজ মনে হয়নি বিধায় উদ্ভব হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং এর। লেনদেন সহজতর হয়েছে ও তৃণমূল পর্যায়ে এ লেনদেন ছড়িয়ে পড়েছে অল্প সময়ে। এ লেনদেন পক্রিয়ার সমস্যা হচ্ছে এতে প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে এবং প্রতারণা হচ্ছে ফলে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলবার সুযোগ ছিলনা। তাই পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে কার্ড ভিত্তিক লেনদেন একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে দ্বীপাক্ষিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এ ধরনের পক্রিয়া সর্বোত্তম বলে বিবেচিত।
অর্থাৎ যখন দুইটি পক্ষের মধ্যে একটি নয় দুইটি লেনদেন সম্পন্ন হয় তখন দুটি পক্ষই দুটি পক্ষকে বিশ্বাস করার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের তৃতীয়বিশ্বের দেশসমূহে যেখানে আইনের শাষনের দূর্বলতার কারণে হরদম নানা প্রতারণা আর জালিয়াতি হয় আবার তার অতি অল্পসংখ্যক ধরা পড়ে আবার ধরাপড়াদের অতি যতকৃঞ্চিত অংশ বিচারের মুখোমুখি হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বস্ত ও নিরাপদ মাধ্যমে লেনদেন হওয়ার যৌক্তিকতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায়না।
ধরি একটি ইকমার্স সাইট থেকে একজন মানুষ একটা পন্য ক্রয় করছেন। এখানে দুটি লেনদেন সংঘঠিত হচ্ছে। প্রথমত ক্রেতা একটি নির্দিষ্ট বাজার মূল্যের পন্য বিক্রেতার কাছ থেকে পাচ্ছেন আবার বিক্রেতা একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ ক্রেতার কাছ থেকে পাচ্ছেন। এই দুটি লেনদেন এখন অবশ্যসম্বাবী আরো সম্পুরুক লেনদেনও এখানে হয়। যেমন ভ্যাট. টেক্স ইত্যাদি। তো মূল দু’টি লেনদেন সংগঠিত হওয়ার জন্য ক্রেতা যেমন বিক্রেতাকে তার আস্থার আওতায় চান আর বিক্রেতাও ক্রেতাকে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত ভাবতে চান। কিন্তু চারদিকে যখন আস্থা ও বিশ্বাসের মারাত্মক সংকট তখন কি ব্যবসায় বানিজ্য বাদ দিয়ে ঘরে বসে থাকা যাবে? সেটার প্রয়োজনও নেই যখন আপনার জন্য রয়েছে একটি ভালো ও উন্নত মাধ্যমে পেমেন্ট গেটওয়ে।
এতে একজন মার্কেটার হিসেবে আপনার খুব বেশী মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই যে আপনার ক্রেতা কি ‘‘কানকাটা রমযান’’ না নাকি ‘‘চল্লিশ চোরের সর্দার’’। কারণ আপনার ক্রেতার রয়েছে বৈধ ব্যাংক একাউন্ট আর তাকে যাচাই করে নিয়েছে ব্যাংক কতৃপক্ষ এবং তার হয়ে আপনাকে ব্যাংকই বলতে গেলে পেমেন্টটা পৌছে দিচ্ছে। আপনার প্রয়োজন তার জন্য সঠিক সেবাটা নিশ্চিত করা।
আবার একজন শপার হিসেবে আপনার যদি আশংকা থাকে যে আপনি ¯্রফে একটা পন্য কিনেত গিয়ে কোনো ‘‘বিশ্ববাটপার’’ বা ‘‘জিনের বাদশাহ’’ র কবলে পড়তে পারেন। সে আশংকাটাও আপনার নেই। কারণ আপনার পরিশোধিত মূল্য আপনার ব্যাংক থেকে তার ব্যাংক একাউন্টে সাথান্তরিত হচ্ছে। যে একাউন্টের বিনিময়ে ব্যাংকে জমা রয়েছে অর্থ গ্রহীতার জাতীয় পরিচয় পত্র, ছবি, স্বাক্ষর, আঙুলের ছাপ, টিআইন নং, ব্যবসার ঠিকানা, ট্রেডিং লাইসেন্স ইত্যাদি। ফলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এভাবে পেমেন্ট গেওয়ের লেনদেন আপনাকে দিয়েছে নিশ্চিন্ত নির্ভাবনা। এবার- চাই আপনি ব্যবসা করুন, চাই শপিং করুন। টাকা বা পন্য লেনদেন নিয়ে টেনশানটাতো গেলো। অনেকে অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্যাশ অন ডেলিভারী পদ্ধতি পছন্দ করে থাকেন। এশিয়ায় বিশেষ করে চীন ও ভারতে এ ধরনের লেনদেন জনপ্রিয় যদিও ইউরোপ আমেরকিা বা উন্নত বিশ্বে কার্ডে পেমেন্টই বহুল প্রচলিত সেটা শপিং মলে কেনাকাটা হোক আর ই কমার্স শপ থেকে হোক। পেমেন্ট গেটওয়ে পদ্ধতিতে একটা চার্জ দিতে হয় বলে অনেকে নিরুৎসায়িত হন যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় আমাদেও দেশে এই চার্জটা অনেক কম।
অনেকগুলো কারণে পেমেন্ট গেটওয়ে লেনদেন উত্তম ও নিরাপদ। প্রথমত ক্রেতার দিক থেকে, এটা ক্যাশ অন ডেলিভারীর থেকে অন্তত একটা ব্যাপারে এগিয়ে। যেমন ধরুন আপনি ‘‘যদুমধু ডট কম’’ থেকে একটি মোবাইল সেট ক্রয় করলেন। কুরিয়ার কোম্পানীর এজেন্ট আপনাকে সেটি ডেলিভারী দিলো আপনি মাল বুঝে পেয়ে টাকা পরিশোধ করলেন। আপনিও মাল পেলেন বিক্রেতাও টাকা পেলো। আপাত দৃষ্টিতে এখানে কোনো সমস্যা দেখা যাচ্ছেনা। কিন্তু আপনার মনে থাকার কথা যে আপনি কিন্তু প্যাকটা হাতে পেয়ে টাকা পরিশোধ করেছেন। এটি খুলে পন্যটি যাচাই বাছাই করার কোনো সুযোগ ছিলনা। টাকা কিন্তু পরিশোধ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে আপনি যদি সঠিক পন্যটি পান তো বেঁচে গেলেন। যদি খুলে দেখন যে পেয়েছেন একটা পাথর, ইটের বা পাথরের টুকরো অথবা মোবাইল সেটই পেলেন কিন্তু সেটা অন্য মডেল বা পুরনো। অথবা নতুনই হলো – মডেলও ঠিক আছে কিন্তু এটা আসলে নকল ক্লোন বা দুই নম্বর। বুঝুন তখন আমি কেবল আপনার ব্যাথার ব্যথী হতে পারবো। আর কিছু নয়।
ঠিক অন্যদিকে আপনি যখন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে লেনদেনটা করছেন। প্রথমে টাকাটা যাচ্ছে একটি তৃতীয় পক্ষের ব্যাংক একাউন্টে বা পেমেন্ট গেটওয়ে কোম্পানীর কাছে এরপর পন্য পেয়ে যদি একটি নির্দিস্ট সময়ের মধ্যে আপনি আপনার সমস্যার কথা বা অসুন্তুষ্টির বিষয়টি তাদের জানান তখনি আপনার পেরিত অর্থ সরাসরি আপনার বিক্রিতার বা পন্য প্রেরকের কাছে চলে যাবে না। এবং এজন্য দাবীদার পক্ষদ্বয়কে তাদের দাবীর সত্যতা প্রমাণ করেই টাকার উপর দখল নিতে হবে। সূতরাং পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে লেনদেন সব দিক থেকে নিরাপদ।
আরো একটা ব্যাপার ব্যবসায়ীদের ভুল গেলে চলবেনা। আপনি যখন পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে লেনদেন করবেন। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি লেনদেন নথিভ’ক্ত হচ্ছে। এতে করে আপনি আপনার ব্যবসায়ের হিসেব ও সার্বিক চিত্রটা সঠিকভাবে পেতে পারেন এবং যখন তখন পারেন। আর নৈতিকতার দিক থেকেও এটা ভালো। আপনি যখন ব্যবসা করে আয় উপার্জণ তরতে চান তখন সঠিকভাবে করলেই ভালো। এবং ব্যাংেকর মাধ্যমে লেনদেন আপনাকে অনেকভাবে কাজে সাহাজ্য করবে। আপনার ব্যাংক লোন কিংবা বিদেশের ভিসাপ্রাপ্তি পর্যন্ত আপনার ব্যাংকের লেনদেনের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।সব কোম্পানীকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রুলস এর মধ্য থেকে লেনদেন করতে হয়।

5,549 total views, 3 views today

Comments

comments