মোবাইল বিজ্ঞাপনে নতুন ধারা সৃষ্টি করবে ইনমোবি মিপ

625

ভারতের মোবাইল বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনমোবি গত বৃহস্পতিবার (আগস্ট ৬, ২০১৫) বেঙ্গালুরুতে মিপ নামে একটি নতুন মোবাইল মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেছে। মোবাইল বিজ্ঞাপনের জগতে মিপ একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করবে।

ইনমোবি সম্পর্কে:

1008pg13b

বিজ্ঞাপন জগতে ফেইসবুক, গুগলের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে টক্কর  দিচ্ছে ইনমোবি। ইনমোবিকে বলা হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী সফটওয়্যার ভেঞ্চার। ২০০৭ সালে ইনমোবি প্রতিষ্ঠিত হয়। অমিত গুপ্ত, অভয় সিংহাল, নবীন তিওয়ারি এবং মোহিত সাক্সেনা মিলে ইনমোবি প্রতিষ্ঠা করেন। এরা সবাই আইআইটির ছাত্র। নবীন তিওয়ারি এর সিইও। বর্তমানে এটি বিশ্বের বৃহত্তম মোবাইল বিজ্ঞাপন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের দুই’শ এর বেশি দেশে এর ব্যবসা আছে। বিশ্বের ১৭টি দেশে ২৪টি অফিস আছে। বিশ্বজুড়ে মোট ১২০ কোটি লোক ইনমোবির সেবা নেয় এবং তাদের ডাটা সেন্টার গুলো প্রতিদিনে ৬০০ কোটি অ্যাড রিকোয়েস্ট সার্ভ করে এবং প্রতিদিন ২৪টেরাবাইটের বেশি তথ্য সংগ্রহ করে। ইউনিলিভার, স্যামসাং সহ বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড ইনমোবির ক্লায়েন্ট। চারটি রাউন্ডে প্রতিষ্ঠানটি ২১৫ মিলিয়ন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফাণ্ড যোগাড় করেছে। ইনমোবির আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের আশেপাশে। বিগত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় গড়ে ৭৫% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মিপ সম্পর্কে:

জুলাই মাসে মিপ যুক্তরাষ্ট্রে অবমুক্ত করা হয়। মিপ একটি অ্যাড ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম। স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন সাথে মিপ ইন্টেগ্রেট করা আছে। ক্রেতা অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করার সময়ে মিপ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সম্পর্কে তথ্য প্রদান করবে যেগুলো ব্যবহারকারী কিনতে আগ্রহী হবে। ইনমোবি ইন্ডিয়ার মহাব্যবস্থাপক আঙ্কিত রাওয়াল বলছেন, “ডেস্কটপ কম্পিউটারে কন্টেন্ট, পণ্য, এবং সেবা সম্পর্কে তথ্য খুঁজে পাওয়ার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে গুগল। মোবাইল জগতে মিপ ঠিক এ কাজটিই করবে।”

ইনমোবি বিগত নয় মাসে ৫০ লক্ষ ব্যবহারকারীকে পরীক্ষামূলক ভাবে মিপ চালাতে দেয়। তারা দাবী করছে স্মা্র্টফোনের প্রথাগত বিজ্ঞাপনের চাইতে তারা অনেক বেশি কার্যকর। ইনমোবি এর ভাষ্যমতে ভারতের অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপাররা তাদের অ্যাপ্লিকেশনে মিপ ইন্টেগ্রেট করে আগামী দুই বছরে আয়ের দিক থেকে বৈশ্বিক মোবাইল বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক এগিয়ে যাবে।

প্রথাগত বিজ্ঞাপন-ক্রেতার বিরক্তি:

প্রথাগত অনলাইন বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে যেটা হয়ে থাকে বিজ্ঞাপনদাতা গণহারে বিজ্ঞাপন দেয় এবং এটা ধরেই নেয় যে এক হাজার লোকে ৫০ জন অন্তত তার বিজ্ঞাপন দেখবে এবং দশ জন কিনবে। অর্থাৎ ৯৯০ জনই কিনবে না। স্মার্টফোনে এ ধরণের বিজ্ঞাপন আরও বিরক্তিকর। কারণ স্মার্টফোনের ডিসপ্লে ছোট এবং অনেক সময় কাজের মধ্যে বিজ্ঞাপন এসে পড়ে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ঐ বিজ্ঞাপন দেখে প্রচণ্ড বিরক্ত বোধ করেন।

মিপ কি এবং এটি কিভাবে কাজ করে?

কল্পনা করুন একটি অতি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন সফটওয়্যার যেটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আপনার উপরে তথ্য সংগ্রহ করে আপনার মোবাইল ডিভাইসে কাজের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে আপনার কাছে আপনার পছন্দের বিভিন্ন ধরণের পণ্য ও সেবার তালিকা তুলে ধরছে। খেয়াল করুন পণ্যের বিজ্ঞাপন নয় শুধুমাত্র তালিকা। আপনিও ঐ তালিকা থেকে আপনার পছন্দের পণ্যটি সাথে সাথে কিনে ফেলছেন এবং কেনার জন্যে আপনাকে নতুন কোন অ্যাপ্লিকেশন বা কিছুই চালু করা লাগছে না ঐ তালিকা থেকেই সরাসরি আপনি কিনছেন। সোজা কথায় এটাই হলো মিপ।

মিপ ব্যাক-এন্ডে কাজ করে আপনার উপরে তথ্য সংগ্রহ করছে-আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সাথে ভাইবারে কথা বলছেন, কি কি ধরণের অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে ব্যবহার করছেন, কার সাথে ছবি তুলে শেয়ার করছেন-ইত্যাদি। একই সাথে মিপ আপনার কাছ থেকেও সরাসরি ফিডব্যাক নেবে। ব্যাক-এণ্ডে এবং প্রত্যক্ষ ফিডব্যাকের উপরে ভিত্তি করে মিপ প্রাথমিকভাবে আপনার পছন্দের পণ্য ও সেবার একটি তালিকা তৈরি করবে। আপনি যখন কোন অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করবেন বা বা কাজ করবেন তখন মিপ আপনার কাজের উপরে ভিত্তি করে আপনাকে সে তালিকা থাকে পণ্য রেকমেণ্ড করবে যা আপনি কিনতে চাইবেন।

ধরা যাক, আপনি টিভি সিরিজ গেম অব থ্রোনস এর একজন বিশাল ভক্ত। আপনি যখন স্মার্টফোনে গেম অব থ্রোনস এর ক্লিপ দেখবেন বা গেইমস খেলবেন, আপনার এ অ্যাকশন থেকে মিপ তথ্য নেবে। এ তথ্য নিয়ে সে গেম অব থ্রোনস সম্পর্কিত একটি তালিকা তৈরি করবে। অনলাইনে কোন প্রতিষ্ঠান গেম অব থ্রোনস এর মার্চেণ্ডাইজ বিক্রী করছে, কোন প্রতিষ্ঠান ডিভিডি বিক্রী করছে, কোন প্রতিষ্ঠান গেম অব থ্রোনস এর গেইমস বিক্রী করছে ইত্যাদি এ তালিকায় থাকবে। এরপর আপনি আবার যখন গেইম অব থ্রোনস সম্পর্কিত কিছু করবেন মিপ তখন আপনার কাজের উপরে ভিত্তি করে এ তালিকা থেকে পণ্য রেকমেণ্ড করবে।

ধরা যাক, আপনি গেম অব থ্রোনস এর ওয়ালপেপার ব্রাউজ করছেন । মিপ তখন আপনাকে গেম অব থ্রোনস এর কতগুলো টি-শার্ট এর তালিকা দিল। আপনি কিছু টি-শার্ট দেখে পজিটিভ এবং কিছু টি-শার্ট দেখে নেগেটিভে ফিডব্যাক দিলেন। আপনার এই ফিডব্যাক থেকে মিপ তথ্য সংগ্রহ করে তার পণ্যের তালিকাকে আরো অপ্টিমাইজ করবে। এভাবে প্রতিমুহুর্তে ব্যবহারকারীর উপরে মিপ তথ্য সংগ্রহ করে তার পণ্যের তালিকাকে আরো উন্নত করে তোলে। আপনি ওয়ালপেপার ব্রাউজার বন্ধ না করে মিপ এর তালিকা থেকে সরাসরি আপনার পছন্দ করা টি-শার্ট কিনে ফেলতে পারবেন।

1

উপরের ছবিতে যে অ্যানিমেটেড বাঁদর মিপ এর  মাসকট ।

2

এ ছবিতে যে বামপাশে যে লাল রঙ এর উইন্ডোটি এটা হচ্ছে ডিসকভারি জোন। আপনি অ্যাপ্লিকেশন চালানো অবস্থায় মিপ এর এরকম একটি ডিসকভারি জোন আসবে এবং এর মাধ্যমে মিপ পণ্যটি সম্পর্কে আপনার ফিডব্যাক সংগ্রহ করবে। যেসব অ্যাপ্লিকেশনের সাথে মিপ ইন্টিগ্রেট করা আছে সেগুলো মোবাইল ডিভাইসে চালালে এ ধরণের ডিসকভারি জোন দেখা যাবে।

3

এভাবে মিপ আপনাকে প্রডাক্ট রেকমেণ্ড করবে। কিন্তু এসব পণ্য কেনার জন্যে আপনাকে নতুন করে অন্য অ্যাপ্লিকেশন খুলতে হবে না। আপনি যে অ্যাপ্লিকেশন চালাচ্ছেন সেখান থেকেই মিপ এর মাধ্যমে আপনি প্রডাক্টটি কিনে ফেলতে পারবেন। ব্যবহারকারী চাইলে মিপ মিউট করে দিতে পারে

প্রথাগত বিজ্ঞাপন এবং মিপের মধ্যে পার্থক্য:  

প্রথাগত বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনদাতা ক্রেতার মুড বা মানসিক অবস্থা বা সে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কি কাজ করছে তা সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখে না। বিজ্ঞাপনদাতা গণ হারে বিজ্ঞাপন দিতেই থাকে। কিন্তু মিপ তা করছে না। মিপ স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর কাজের উপরে নজর রাখছে এবং ক্রেতার কাছে থেকে ফিডব্যাক নিচ্ছে। ব্যবহারকারীর কাজের ধরণ বুঝে মিপ তার জন্যে পণ্য ও সেবা টার্গেট করছে এবং তাকে পণ্য ও সেবা কিনতে উৎসাহিত করছে। সবচেয়ে বড় কথা মিপ থেকে সরাসরি ক্রেতা পণ্য ক্রয় করতে পারছে। তাকে তার কাজ বন্ধ করে নতুন অ্যাপ্লিকেশন খুলে পণ্য কিনতে হচ্ছে না।

নবীন তিওয়ারির বলেন, “বর্তমানের মোবাইল বিজ্ঞাপন গুলো জানেই না যে তাদের গল্পের আসল হিরো কে? আসল হিরো হচ্ছে ক্রেতা। মিপ এর মাধ্যমে আমরা ক্রেতাকে সব কিছুর উর্ধ্বে গুরুত্ব দিচ্ছি এবং তার মানসিক অবস্থা, ব্যক্তিগত পছন্দ, অপছন্দের উপরে ভিত্তি করে তার জন্যে পার্সোনালাইজ কন্টেন্ট ডেলিভারি দিচ্ছি।”

ইন মোবির ১০ কোটির বেশি পণ্য ও সেবার তালিকা আছে এসব তালিকা থেকে মিপ আপনাকে পণ্যের তথ্য এনে দেবে। এছাড়াও অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশন থেকেও মিপ তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহারকারীর সামনে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ক্রয়ের জন্যে রেকমেণ্ড করবে।

মিপ/ডি-কমার্স এর সম্ভাবনা: 

এই যে এতক্ষণ ধরে মিপ এর কাজের প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিলাম একে বলা হচ্ছে ডিসকভারি কমার্স বা ডি-কমার্স। ই-কমার্স এম-কমার্স এর পরে এখন আসছে ডি-কমার্স। মিপ এর মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খুব সহজে অনলাইনে ক্রেতাকে তাদের পণ্য ও সেবা ক্রয়ে উৎসাহিত করতে পারবে।

মিপ এর নির্মাতারা দাবি করছেন যে মিপ বিশ্বের বৃহত্তম ডি-কমার্স প্ল্যাটফর্ম হবে। ইনমোবির মতে ২০১৮ সাল নাগাদ মোবাইল লেনদেনের অর্ধেকের বেশি সম্পাদিত হবে ডিসকভারি কমার্স এর মাধ্যমে। মিপ প্রতিমাসে ১০,০০০ কোটি শপিং সেশন এবং ৫০০ কোটি শপিং এক্সপেরিয়েন্স ট্র্যাক করছে। আগামী বছরের মধ্যে মিপ এর মাধ্যমে ইনমোবি ১০০ কোটির কাছাকাছি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

ভারতে মিপঃ

ভারতে বর্তমানে মিপ এর বেটা ভার্সন ছাড়া হয়েছে। বেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভারতে মিপ এর পার্টনার হয়েছে যার মধ্যে- অ্যামাজন ইণ্ডিয়াম্যাগজটারমানিভিউ, নেস্ট অ্যাওয়েপেটিএম, শপক্লুজ, সুইগি, আর্বান ল্যাডার, ভক্সপপ, উপলার, জিম্বার। ভারতে মিপ এর মাধ্যমে সরাসরি কেনাকাটা করার জন্যে পেটিএম প্ল্যাটফর্ম সেবা প্রদান করবে।

বর্তমানে ভারতে প্রতিমাসে ১২ কোটির বেশি স্মা্র্টফোন ব্যবহারকারী ইনমোবির নেটওয়ার্কে সক্রিয় এবং চল্লিশ হাজারের বেশি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের সাথে “মিপ বাই-বাটন” দেয়া আছে।

নবীন তিওয়ারির মতে, মিপ এর ডিসকভারি কমার্স আগামী ১২-২৪ মাসের মধ্যে ভারতে স্মার্টফোনে নতুন পণ্য খোঁজার ৮০% এবং মোবাইল লেনদেনের ৫০% মিপ এর মাধ্যমে আসবে। এর ফলে পণ্যের মার্চেন্ট এবং মোবাইল মার্চেন্ট দারুণভাবে উপকৃত হবে।

সূত্র:

দ্যা ইকনোমিক টাইমস

এনডিটিভি গ্যাজেটস

ইয়োর স্টোরি

হিন্দুস্তান টাইমস

ইঙ্ক ৪২ ডট কম

লেখক: এস এম মেহদী হাসান

Comments

comments

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *