1488021_518485024934547_866611973_n

উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য মানসিকতার পরিবর্তন চাই

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

মানসিকতা একটা বিরাট ব্যাপার উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য। মানসিকতা থাকতে হবে। এই মানসিকতার মধ্যে রয়েছে ১. স্রোতে গা না ভাসিয়ে দিয়ে অন্যরকম কিছু করার চিন্তা। ২. রয়েছে নিজের আত্মবিশ্বাস রেখে কিছু একটা করে দেখানোর জেদ। ৩. রয়েছে ঝুকি নিয়ে সেটা সামাল দিয়ে মাথা তুলে দাড়ানোর ক্ষমতা ৪. সামনের পথটা অনেক দূর অবধি দেখতে পারার মতো শক্তি। আগামী দিনগুলোতে কি হবে তা বুঝতে হবে এখনই। ৫. এবং কিছু ব্যক্তিগত যোগ্যতা।

১. অন্যরকম কিছু করার চিন্তা।

লেখাপড়া মানে চাকরী করা এই চিন্তাটা মাথা থেকে বের করে ফেলে দিতে হবে। তাহলে এই চিন্তার বাইরে রয়েছে পেশাগত জীবন ও ব্যবসায়। পেশাগত জীবন মানে আইনজীবি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আমি স্বাধীন পেশার কথা বলছি।পেশা বাদ দিলে থাকে ব্যবসায়িক উদ্যোগ। একটা পর্যবেক্ষনে দেখা গেছে। যারা ঠেকায় পড়ে ব্যবসায় করে আর যারা ছাত্রজীবন থেকে উদ্যোক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের মধ্যে প্রথম পক্ষই সফল হয় বেশী। আবার যারা বিভিন্ন কাজে ব্যর্থ হয়ে পরিশেশে ব্যবসায় করে তাদের মধ্যে যারা অনেক বেশী চোট খায় তারাই সফল হয়। এই দুই সফল গ্রুপ দুইভাবে ব্যবসায়ের প্রস্তুতি ও শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। প্রথম সফল গ্রুপ যারা ছাত্রজীবনে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে আর স্বপ্নকে সফলতার তাড়িয়ে নিয়ে যায় তারা চারপাশের সবকিছু থেকে শিক্ষা প্রহণ করে প্রতিনিয়ত আর নিজের পথটাকে তখনিই ঠিক করে নেয়। আর দ্বিতীয় সফল গ্রুপে যারা রয়েছেন এরা নানা ঘাত প্রতিঘাত ব্যর্থতা ও প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে জীবনের শিক্ষাগুলোকে কাজে লাগাতে শেখে।

এজন্য আমাদের আগে থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা রাখেতে হবে । কোনো বিশেষ পরিস্তিতিতে যদি তা করা না যায় তাহলে অন্য কিছূ। আমরা চীনের দিকে তাকালে বুঝতে পারি। উদ্যোক্তা হওয়ারি মানষিকতাই তাদেরকে অর্থনীতির মোড়ল বানাচ্ছে। আর তার বিপরীতে আমরা খুব ছোটখাটো জিনিস যেগুলো খুব সহজে তৈরী করা যায় সেগুলো আমরা চীন থেকে আমদানী করি, যেমন ধরুন একটা হাতুড়ী ধরুন একটা সেপটিপিন।একবার ভেবে দেখুন আমরা কতটা পরনিভর্রশীল জাতি।

২. আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলা

আত্মবিশ্বাস থাকা আর না থাকা সব কাজের মধ্যে পার্থক্য তৈরী করে দেয়। যেমন আপনি যদি আত্মিবিশ্বাসহীন হোন তাহলে যতই সমস্যা হবে আপনি ততই ভাববেন আপনাকে দিয়ে হবেনা। আর আপনার যত আত্মবিশ্বাস থাকবে ততই আপনার মনে হবে আপনি পরের বার সফল হবেন। এখানে একটা কথা গুরুত্ববহ। আপনি যে নিজেকে যোগ্য বা অযোগ্য মনে করছেন তা কোনো আবেগ থেকে নয়, বাস্তবতার আলোকে বিচার করুন।

আর সবচে বড়ো বিষয় হলো জানুন শিখূন বুঝুন। প্রয়োজনে যখনি যে কাজে হাত দেবেন তার সফলতা্ ব্যর্থতা নিয়ে কোনো মন্তব্য বা ধারনা করার আগে সে বিষয়ে অন্তত একটি বই কিনুন, নেটে অন্তত ১০টি আর্টিকেল পড়ুন, পরিচিত অন্তত ৫ জনের সাথে কথা বলুন যারা এই বিষয়ে জানে। এই তিনটি কাজ বইপড়া নেট সার্চ এবং পরামর্শ না করে কখনো মনে করবেন না আপনি অনেকে জেনে গেছেন। হয়তো আপনি যেকোনোভাবে একবারে এই সমপরিমাণ জ্ঞান বা ধারনা নিয়েছেন কিন্তু জানতে আপনাকে হবেই। তারপর আপনার রাস্তা আপনি খুজে নেবেন। এতে করে আপনি ব্যবসায়ী হয়ে যাবেন তা নয়, আপনি আপনার পরবর্তী করনীয় কি সেটা ঠিক করতে পারবেন। এমন হতে পারে এই তিনটি কাজ করার পর আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন এই বিষয়ে যত তথ্য আছে আগে সব জেনে নিই। আবার এমনও হকত পারে জানার পর আনপার মনে হলো না বরং আপনাকে এটা বাদ দিয়ে অন্য কিছু ভাবতে হবে। তবে এই জানা এটা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে আপনার আবেগকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

 

৩. ঝুঁকি সামাল দেয়া

ব্যবসায় করলে ঝুকি নিতে হবে। এটা পুরনো কথা বরং আমরা এটাকে এভাবে ভাবি যে ব্যবসায়ী হতে হলে ঝুঁকি সামাল দেয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। এই ঝুকি তিনভাবে সামাল দেয়া যায়। ক. ঝুকি আছে জেনে নিয়ে এমনভাবে প্রস্তুতি দেয়া যাতে ব্যবাসায়ের কোনো লোকসান বা ক্ষতি না হয়। খ. ঝুকির মাত্রা যেন কম হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্টে বা ব্যবস্থা রাখা। গ. ঝুকি ব্যবসায় লোকসান ক্ষতি বা আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশী হয়ে গেলে সেটা কাটিয়ে উঠার জন্য প্রয়োজণীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

একজন ভালো ব্যবসায়ী মূলত তিনটি প্রথই অবলম্বন করেন একটা ঝুকি সামাল দেয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি মানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত এমনভাবে নেন যাতে লোকসানের কোনো আশংখা না থকে। আবার তিনি যখন দেথতে পান লোকসান হচ্ছে তখন বিভিন্ন একে নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় মাত্রায় রেখে দেন যাতে এই ক্ষতির কারণে তার ব্যবসায়ে কোনো প্রভাব না পড়ে। আবার ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরও কি করতে হবে বা কিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে তিনি তা ভালো করে জানেন।

৪. সামনের পথটা অনেক দেখতে পাওয়া:

হ্যা এটা ব্যবসায়ের একটা অপরিহার্য বিষয়। একজন উদ্যোক্তা খুব সহজে যেন বুঝতে পারেন। আগামী দিনে কোন পন্যের চাহিদা রয়েছে, অথবা একই ধরনের পন্য নিয়ে ববসায়ে নামতে হলে ঠিক কিভাবে পরিবেশন করলে তিনি ভোক্তার মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পারবেন। কোনে সিজনে কি পরিমাণ পন্য সেল হতে পারে। এবং হালের ক্রেজ বা প্রবণাতা কোন দিকে যাচ্ছে।?

একটা কথা আমি বলে থাকি যে, আপনি যদি টেকনিক্যাল কোনো কিছু না জানেন তার জন্য লোক রাখতে পারবেন, কারিগরি বা মেকানিক্যাল কোনো বিষয়ও তাই। এমনকি মার্কেটিং, ব্রান্ডিং, ম্যানেজমেন্ট, যোগাযোগ, ডেলিভারী এসবের জন্য আপনি লোক রেখে সার্ভিস আদায় করতে পারবেন আপনার সীমাবদ্ধতার একটা অংশ পূর্ণ করতে পারবেন কিন্তু আপনি নিজে যদি ব্যবসায় না বোঝেন বা ব্যবসায়ের সামনের দিনগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখতে না পারেন। সেটা আপনি কোটি টাকার বিনিময়েও হাসিল করতে পারবেন না।

৫. ব্যক্তিগত যোগ্যতা।

উদ্যোক্তার সামাজিক যোগ্যতা থাকবে তিনি সব ধরনের লোকদের সাথে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরীর মাধ্যমে যোগাযোগ সৃষ্টি ও রক্ষা করতে পারবেন। তিনি তার নিজের ব্যবসায় সম্পর্কে শিক্ষিত হবেন। যেমন একজন কৃষক তিনি লেখাপড়া না জোনলেও। কখন কিভাবে ধান লাগাতে হয় তিনি জানেন, তিনি জমি চাষ পদ্ধতি জানেন, তিনি জানেন কতদিনে চারা হয়! তিনি জানেন কখন ধান পাকবে। ধান দেখে তিনি নাম বলে দিতে পারেন। চাল দেখে বলতে পারেন ভাত কেমন হবে। দেখুন তার কাজের বিষয়ে তিনি কত দক্ষ। ঠিক আপনি যে বিষয়ে ব্যবসায় করবেন সে বিষয়ে আপনাকে এমনি দক্ষ হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

ই কমার্স বা অনলাইন ব্যবসায়টা জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় এখানে আপনাকে তিনটা বিদ্যা জানতেই হবে। এর একটা কম হল্ও আপনার জন্য ঝুকি রয়েছে।

প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বিদ্যা। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা হলো আমরা যা স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে অর্জন করি। আর সামাজিক বিদ্যা হলো আমরা যা সমাজ থেকে শিখি, যেমন পারষ্পরিক আচরন, অপরের প্রতি সম্মান ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিও ব্যবসায়িক জ্ঞান। ই কমার্স ব্যবসায়ের জন্য এটা জরুরী আপনি একটি নুন্যতম ধারণা নিয়ে শুরু করবেন এবং নিয়মিত নিজেকে আপডেট রাখবেন সবর্শেষ প্রযুক্তি ও এপস সম্পর্কে। এতে নূনতম ধারনা না হলে চলেনা আবার প্রথমে অনেক জানলেন পরে আর কিছু জানার দরনকার মনে করলেন না, সেটাও আত্বঘাতি হবে। কারণ প্রতিনিয়ত নতুন প্রযক্তি এসে আমাদের কাজের গতকালের ধারণা পদ্ধতি ও ফলাফলকে বদলে দিচ্ছে।

তৃতীয়ত: সাবজেক্টিব জ্ঞান। এটা হচ্ছে আপনি ঠিক যে পন্য বা সেবাটি নিয়ে কাজ করছেন তার জানা। এটা হতে পারে সমুদ্রের লইট্টা শুটকি, হতে পারে সুন্দরবনের মধু। সে যাই হোক তার সম্পর্কে আপনার সম্যক ধারনা থাকা চাই। এটি কোথায় পাওয়া যায়, কখন পাওয়া যায়? কিভাবে সংগ্রহ করতে হয়, কোথায় কোয়ালিটি ও দামের পার্থক্য কেমন? কোথাকার প্যেণ্যর উপর ভোক্তার আগ্রহ বেশী বা কম এবং সেটা কেন? কারা এই ব্যবসায় করছে, তাদের কি প্রতিফল, যদি ভালো করে থাকে তাহলে রহস্যটা কি, যদি খারাপ পরিস্তিতি হয় তাহলে কারনটা কি? আরো এতসব ব্যাপার।

আমাদের মানষিকতা বদলালে আমরা যেমন সত্য জানতে পারবে, সঠিক তথ্যের কাছে যেতে পারবো এবং উদ্যোক্তাকে তার ব্যবসায়িক মেজাজ রেখে পথে পা বাড়াতে পারবে। আবার আমরা জেনে শুনে বুঝে কাজ করলে লভ্য জ্ঞানের দ্বারা আমরা আমাদের মানসিকতায় ইতিবাচক ও কাযকর পরিবর্তন আনতে পারবো যা আমাদের সাফল্য লাভের পথে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

 

1,954 total views, 9 views today

Comments

comments