সুপার সেলম্যানের গল্প
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
আজ এরকম অসাধারণ কোয়ালিটি সম্পন্ন একজন সেলম্যানের দক্ষতার গল্প শুনি।
আমাদের চোখের সামনে আমরা দেখি এক জীবনে অনেক মানুষ ব্যবসা করে সফল হন। অনেকে মার্কেটিং বা সেলসম্যান হিসেবে সফল হন। আজ এমন একজনের গল্প শেয়ার করবো তিনি সুপার সেলসম্যান বা সুপার প্রতারক বলা যেতে পারে। তবু তার যে দূরন্ত সাহস ও আত্মবিশ্বাস ছিলো এটা জেনে অবাক হওয়া ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের কথা। তখনও ব্রিটিশরা বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। লন্ডন শহরের ট্রাফালগার স্কোয়ার, যেখানে ইউরোপ আমেরিকার লোকেরা ঘুরতে যান। কোনো পর্যটক লন্ডন শহরে গেলে সেখানে যেতে ভুলেন না। এখানেই একটা বিশাল উঁচু টাওয়ারে যুক্তরাজ্যের গ্রেট হিরো এডমিরাল লর্ড নেলসনের একটি স্ট্যাচু রয়েছে। যে কলামের উপর তা রয়েছে বৃটিশদের ঐতিহ্যের প্রতীক নেলসন কলাম। জাতীয় ইজ্জতের একটা প্রতীকও বলা যায়।
এসময় এশহরে আসেন এক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। বাঁশিওয়ালা না বলে বলি চাপাবাজ। যার চাপার জোরে তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন লেনসন কলাম, এমনকি লন্ডনের ব্রিটিশ রাজবাড়ী বার্কিংহামপ্যালেসও বেচে দিয়েছেন তিনি। ঘটনাটা খুলেই বলি। ১৯২০ সালে একজন ধনী আমেরিকান ব্যবসায়ী ট্রাফালাগার স্কোয়ারে ঘুরতে আসেন। সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় সেই বাশিওয়ালা স্কটিশ নাগরিক আর্থার ফারগুসানের সংগে। ফার্গুসান তার কাছে নিজেকে ‘ ভলান্টারী টুরিস্ট গাইড’ বলে পরিচয় দেয়। একজন ভলান্টিয়ার গাইড পেয়ে আমেরিকান ভদ্রলোক উৎসাহ ভরে গাইড এর কাছে এটা ওটা জানতে চাইতেই পারেন। ভালোই চলছে গাইডগিরি। হঠাৎ করে স্কটিশ বংশীবাদক দুঃখ ভরে বললো, ‘স্যার আপনিই বলুন, এই নেলসন কলাম, তার স্ট্যাচু এখান থেকে সরিয়ে ফেললে এর সৌন্দর্য আর কি থাকবে?’ আমেরিকান ভ্রমনকারী উৎসুক্যের সাথে জিজ্ঞেন করলেন, ‘কেন, কী হয়েছে, এখানে এটা থাকবে না কেন?’ আর্থার চিন্তিত স্বরে বলে, ‘জানেনতো বৃটিশ সরকার এখন যুদ্ধোত্তর অর্থনীতির বোঝা টানতে পারছেনা। তাই টাওয়ারটি বিক্রী করে দেবে। আমেরিকান জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি জানেন এর দাম হবে কতো?’ আর্থার প্রথমে বলল ব্যাপারটা খুবই সেনসেটিভ এবং সিক্রেট। তারপর ঘুরিয়ে পেচিয়ে অনেক কথার পরে দাম বলল ‘‘ যদি নগদে ৬০০০ (ছয় হাজার) পাউন্ড পায় তাহলে সরকার বিক্রী করতে রাজি আছে। আর্থার আমেরিকান ভদ্রলোককে খুব করে বললো, ‘ আসলে তারাতো এ দামে বিক্রী করতে চায় না, আমি অনেক বলে কয়ে সরকারের কর্ ব্যক্তিদের রাজী করিয়েছি। ভদ্রলোক ধরে নিলেন যে আর্থারের চ্যানেল অনেক উচুতে। কাস্টমারের প্রতি ফার্গুসানেরেআন্তরিকতাও মুগ্ধ করলো।
তার দক্ষতাও প্রশ্নাতীত। ফার্গুসান পুরো টাওয়ারটি খুলে শিপমেন্ট করার জন্যে একটি কোম্পানীর নামও তার আমেরিকান ক্রেতাকে বলে দিলো। এবং শিপমেন্ট এর সব ডকুমেন্টও দেখালো সব কিছুই যখন পাক্কা তখন মার্কিনী তার হাতে ৬ হাজার পাউন্ডের একটি চেক দিয়ে দিলেন। আর কি?
খুশির জোয়ারে আমেরিকান ভদ্রলোক পরের দিন ডিসমেন্টাল করার জন্যে কোম্পানীর অফিসে গিয়ে হাজির। আমেরিকান ভদ্রলোকের কথা শুনে তারা আকাশ থেকে পড়লেন! বলে কি লোকটা! সাথে সাথে তারা জানালো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডেকে। ততোক্ষণে আর্থার ফারগুসান ৬ হাজার পাউন্ডের চেক ক্যাশ করে উধাও। নেলসন টাওয়ার বিক্রীর সফলতায় তখনো সে মাতোয়ারা।
ছবি: এই লেনসন স্কয়ার, যাকে কমপক্ষে চার বেচে দিয়েছে আর্থার ফার্গুসান
ততক্ষনে আমেরিকান ভদ্রলোকটি বুঝলেন যে তিনি পথে বসেছেন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে আর্থার ফারগুসানের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলেন তখন দেখলেন তাদের ফাইলে এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ধরনের আরো বেশ কয়টি সরকারী সম্পত্তি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। আসলে ১৯২০ সালে যতটা সহজ ততটাতো এখন আর নয়। আর তখনকার যুগে যে সাহস দেখালো এখন সেটা সম্ভব কি?
তার নামে অভিযোগ এর অন্ত নেই। এবং সব বনেদি অভিযোগ। আরো এক আমেরিকান বলেছেন, তিনি ফার্গুসানকে ‘বিগ বেন’ কেনার জন্যে ১ হাজার পাউন্ড দিয়েছেন। আরেক জন নাকি তার কাছ থেকে বাকিংহ্যাম প্যালেসটাও কিনেছেন দু’হাজার পাউন্ড দামে। প্রথম কিস্তির টাকা নেবার পর আর এখন ফার্গুসান এর দেখা নেই। দলিলটা সে এখনো রেজেস্ট্রী করে দিচ্ছে না! না ভাই আমেরিকানদের বোকামীর এরকম অনেক নজীরই আছে। তবে ফার্গুসান এর দক্ষতার কথা আমরা কিভাবে অস্বীকার করি।
এতো ঘটনার পর পুলিশের কি বসে থাকার সুযোগ আছে? গুরুত্বপূর্ণ মামলা, স্বভাবতই পুলিশ তাকে খোজা শুরু করলো। সে তখন তার ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নিলো। চলে গেলো তার কাস্টমারদের দেশে সে মার্কিণ মূলুকে। মানে ইতোপূর্বে সে যেসব দেশের বেশী লোককে ঠকাতে পেরেছ। ১৯২৫ সালে আমেরিকায় নেমেই তার দৃষ্টি পড়লো ওয়াশিংটনের সেরা বিল্ডিং হোয়াইট হাউসের প্রতি। কিভাবে এই হোয়াইট বিক্রি করা যায়। এত বড় আর সুন্দর । এটাই এখন তার হট প্রোডাক্টস। হোয়াইট হাউসের মূল্য তো আর কম নয়।
অবশেষে এক পশু খামারের মালিকের কাছে একবারেই মার্কিণ সরকারের পক্ষ থেকে সোজা ৯৯ বছরের জন্যে হোয়াইট হাউসকে সে ‘লীজ’ দিয়ে বসলো। এটা লীজ দেয়া যুক্তি হিসেবে সে জানালো জর্জ ওয়াশিংটনের যুগে গ্রহণ করা বিরাট অংকের একটা লোন পরিশোধ করার জন্য তাদের এটা বিক্রি করা দরকার। মাত্র ১ লাখ ডলার বছরে কিস্তি। প্রথম বছরের প্রিমিয়ামটা অগ্রিম না দিলে লীজ দেয়া হবেনা। এসব আগম বাগম বলে সে এক বছরের অগ্রিম প্রিমিয়ামের টাকা নিয়ে চম্পট। বোঝেন আমেরকিার হোয়াইট হাউস সেটা আমেরকিার লোকদের কাছে লীজ দিচ্চে তাও কিনািএকজন ব্রিটিশ। কি জানু বাপু এই জন্যই মনে হয় লোকে অতি চালাকদের লোকদের ব্রিটিশ বলে ডাকে।
আমাদের আজকের সুপারম্যান আর্থার ফারগুসান এবার ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টী’টা বিক্রি করার ফন্দি আটলো ,এবার।
এবারের শিকার একজন অস্ট্রেলিয়ান। তিনি নিউইর্কে ঘুরতে এসেছেন। আর্থার তাকে বুঝালো নিউইয়র্ক বন্দর কর্তৃপক্ষ হার্বার বাড়াবার এক সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কিন্তু ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টী’টা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো ক্রেতা পেলে এটা বিক্রী করে দেবে। সে এটাও বোঝালো সমগ্র বিষয়টার সাথে মার্কিন জাতির সেন্টিমেন্টের প্রশ্ন জড়িততো, এজন্য এটা তারা প্রকাশ্য বিক্রি করতে চায়না। ক্রেতা যখন কিনতে চাইলো তখন সে বললো, এক শর্তে আপনার কাছে বিক্রি করা যাবে, তা হলো কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত বিষয়টা গোপন রাখতে হবে। অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোক শেষপর্যন্ত শর্তমত রাজী হলেন, ফার্গুসান একদিন পর এসে জানালো যে অনেক দরদাতাকে ডিংগিয়ে সে সফল হয়েছে প্রথমে কতৃপক্ষ রাজি হয়নি, কিন্তু একটা কথা আছে ১ লাখ ডলার ডিপোজিট দিলে তারা ডিসমেন্টাল করার জন্যে কয়েক মাস সময় দিতে সম্মত আছে। যথার্থ যুক্তি, এতবড় একটা ব্যাপার, ১ লাখ ডলারতো জলভাত। যথারীতি ভদ্রলোক এই দক্ষ সেলসম্যানেক এক লাখ ডলার এর চেক দিয়ে দিলেন। ভাইরে সেকালে এক লাখ ডলার মোটেও ডালভাত ছিলনা। হয়তোবা হাতে গোনা কয়জন মানুষই ১ লাখ ডলারের মালিক ছিলো। যেমন লাখ ডলারের মালিক, তেমনি তার খায়েশ, তেমনি পন্য আর মিডিয়াম্যনেরতো জবাবই নেই।
কেনা হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্পকর্র্ম । পরে হলো কি! অনেক দিন ধরে যখন মিডিয়াম্যান ফার্গুসান এর কোনো পাত্তা নেই তখন ভদ্রলোক বাধ্য হয়েই থানায় গেলেন। এবার এফ বি আইর লোকেরা হন্যে হয়ে আর্থারকে খুঁজতে লাগলো। ভাগ্য ভালো যে একটি মাত্র ‘ক্লু’ তাদের হাতে আছে, তা হচ্ছে আর্থারের একখানা যৌথ ছবি যা সে উঠিয়েছিলো স্ট্যাচু অব লিবার্টির নিচে দাড়িয়ে সে অস্ট্রেলিয়ান খদ্দেরের সাথে।
অবশেষে পুলিশ তাকে ১৯২৬ সালে আটক করতে সক্ষম হয়। এই বিশাল অপকর্মের জন্য ৪ বছরের জেল হয় তার। ১৯৩০ সালে সে মুক্তি পেয়ে ১৯৩৮ সালে এই সুপার সেলসম্যান লস এঞ্জেলসে ভব-লীলা সাংগ করেন।
এ ধরনের একটি গল্প বলার চেয়ে সত্যিকার একজন সফল সুপারসেলসম্যানের গল্প বলা বেশী প্রয়োজন ছিলো। তাতে শিক্ষনীয় হতো। সেসব গল্প পাওয়া কঠিন কিছু নয়। অথবা । কিন্তু এ ধরনের বৃহৎ জিনিস বেচার গল্প নিশ্চয় আর খুব বেশী নেই।
বাংলাদেশে বর্তমানে তরুন উদ্যোক্তাগণ সেলস নিয়ে থুব টেনশনে আছেন তারা যদি এ বিষয়ে একটু গতি পান বা ইতিবাচকভাবে উৎসাহিত হন। কারণ একজন প্রতারক যদি তার বৈধ কোনো ডকুমেন্টস ছাড়া এতবড় জাতীয় সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন। তাহলে তরুন প্রজন্মের এত প্রাণশক্তি দিয়ে বৈধভাবে বৈধ মার্কেটিং কেন করতে পারবোনা। আমরা মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করবো, বাসায় পৌছে দেবে তাহলে কেন সফল হবো না। তাই আমাদের উচিত সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তির কাছে সঠিক ভাবে সঠিক পন্যের সঠিক মেসেজ পৌছে দেয়া।
সূত্র: ১. দজ্জালের পা, হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ, মুনমুন পাবলিশিং হাউস, ঢাকা ২০০৪।
10,795 total views, 5 views today
