3

ই-কমার্স উদ্যোগে নারী

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে বাংলাদেশে ই-কমার্সের সূচনা হয়। বাংলাদেশে ২০২০ সালে ই-কমার্সে ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজার বলা হচ্ছে এবং ২১ শেষে এটা ২৪ হাজার কোটি টাকা হওয়ার কথা ছিল সেটা কিছুটা হোঁচট খেয়ে ২২ হাজার কোটিতে ঠেকেছে, কিন্তু ২০২২ এ এটা ৩০ হাজার কোটি পার করেছে বলে সংশ্লিষ্ঠরা মনে করছেন। এই প্রবৃদ্ধি কিন্তু ২০ বছর ধরে হয়নি। প্রবৃদ্ধির সহায়ক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিকশিত হতে শুরু করেছে ২০১০ সালের পরে। এবং প্রবৃদ্ধির ধারায় ই-কমার্স যুক্ত হয়েছে ২০১৬ সালে। তৎপরবর্তী বছরগুলোতে ২৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এই খাত। করোনাকালীন সময়ে এই খাতের প্রবৃদ্ধি ক্ষেত্রবিশেষে ২৬৭% থেকে ৩০০% পর্য্ত ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে এই খাতে খন্ডকালীন নারী উদ্যোক্তাদের বিশাল একটা অংশের আত্ম প্রকাশ ঘটে।

বর্তমানে ই-কমার্ষ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ই-ক্যাবের সদস্য সংখ্যা ২ হাজারের বেশী। এবং দেশে কমপক্ষে ৩ হাজারের বেশী ই-কমার্স ও ই-কমার্স সংক্রান্ত পণ্য সেবার অনলাইন ব্যবসা রয়েছে। পেশাদার ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের ১৪% এবং ই-কমার্স খাতে পূর্ণকালীন ও সরাসরি যুক্তদের ২১% নারী।  দেশে ৩ লাখ ৫০ হাজার কর্মী কাজ করে তাদের ২১% নারী।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের ৫০ ভাগের বেশী নারী। বিশেষ করে গৃহবধূরা তাদের ঘরে বসেই তাদের নিজের হাতে উৎপাদিত পণ্য, পরিবারের উৎপাদিত পণ্য কিংবা তারপক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব এমন পণ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার করে ছোট পরিসরে ব্যবসা করছেন। বিগত ৫/৭ বছরে তাদের অনেকের অনলাইন ব্যবসার প্রসার এতটাই হয়েছে যে, কারো কারো দৈনিক অর্ডারের পরিমাণ অনেক প্রখ্যাত ব্রান্ড এর চেয়ে বেশী।

বর্তমানে দেশে ৫ লক্ষের বেশী ফেসবুক কমার্শিয়াল পেইজ রয়েছে। এর মধ্যে লক্ষাধিক পেইজ রয়েছে প্রচলিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের। বাকী ৪ লক্ষ পেইজ অনলাইন উদ্যোক্তাদের। মোট বেচাকেনা হয় অন্তত ২ লক্ষ ৫০ পেইজ থেকে, অন্তত ৫০ হাজার পেইজ থেকে নিয়মিত বেচাকেনা হয়। যাদের অর্ধেকের বেশী নারী। বাংলাদেশে প্রতিদিন অনলাইনে যে পরিমাণ অর্ডার হয় তার ৪০% হয়ে থাকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাধমে।

দেশে এসএমইদের একটা বড় অংশ নারী।  সরকার প্রতিবছর দেশব্যাপী বিভিন্ন এসএমই মেলা আয়োজন করে সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা করার সুযোগ দিয়ে থাকে। এসব মেলায় অংশগ্রহণকারীদের ৬০ ভাগই নারী উদ্যোক্তা। এবং অনলাইন বিজনেস সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের ৪৬% নারী।

দেশে গৃহশ্রমিক বাদে ক্ষুদ্র উদ্যোগের ক্ষেত্রে এসএমই খাতে শ্রমিক কর্মচারীদের ৬০% শতাংশের বেশী নারী এবং তাদের বড়ো একটি অংশ কৃষি উদ্যোগের সাথে জড়িত। বিগত এক দশকে (২০১১- থেকে ২০২১১) নারী উদ্যোক্তা বেড়েছে ১২৬% শতাংশ।

দেশীয় এক গবেষণার ফলাফলে জানা যায়, গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, ২০০৯ সালে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে শিক্ষিত ২০ শতাংশ নারী ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০১৭ সালে তা বেড়ে ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়া ২০০৯ সালে ৪২ শতাংশ নারীকে পারিবারিকভাবে ব্যবসায় সম্পৃক্ত হতে নিরুৎসাহিত করা হতো। ২০১৭ সালে তা ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৯ সালে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ২৮ শতাংশ নারীকে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করতে হয়েছে। ২০১৭ সালে এটি ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৯ সালে ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা ট্যাক্স দিতেন, যা ২০১৭ সালে ৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ২০০৯ সালে ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা ব্যবসার জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করতেন, যা ২০১৭ সালের বেড়ে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সবই দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বলে গবেষণার ফলাফলে পাওয়া গেছে।

একসময় বাংলাদেশে নারীদেরকে ঘরের বাইরে কোনো কাজেই সুযোগ দেয়া হতো না। বিগত কয়েক দশকে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হলে নারীরা নিজের বাগানে কাজ করতে পারতেন চাকরী হিসেবে তাদের জন্য শুধু মাত্র নার্সিং এবং শিক্ষকতাকে যথোপযুক্ত বলে মনে করা হতো। বর্তমানে এই পরিস্থিতি বদলেছে। নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোগের ক্ষেত্রে সফলতা এবং কর্পোরেট খাতে বেশ কয়েকজন নারীর সফল নেতৃত্ব সামাজিক পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। তার পাশাপাশি রয়েছে সরকারের সহযোগিতা। এর মাধ্যমে কর্মজীবি নারীদের এখন উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবসায় উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যবসা খাতে তাদের অংশগ্রহণ ৩১% ছাড়িয়েছে। এছাড়া পোশাক বিক্রিতে তাদের সংখ্যা ৪০% শতাংশের কাছে গিয়েছে। ও তৈরী খাবার বিক্রিতে তাদের দখলদারিত্ব ৬৭% সরাসরি এবং আরো ২০% পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

দেশে ৫০ হাজার রেস্টুরেন্ট এর সাথে সমান প্রতিযোগিতায় তৈরী খাবার বিক্রি করছে গৃহবাসী আরো ২ হাজার নারী। আর রেস্তোরা ব্যবসায়ীদের ৫% শতাংশ এবং হোটেল ও ট্যুরিজম খাতের ৪% নারী সেবা দিচ্ছে। যা বিগত ১০ বছর আগের তুলনায় ২০০% বেশী।

সংখ্যায় বেশী হলেও নারী উদ্যোক্তাদের ৯৯% শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কমমূল্যের সেবা সেবা প্রদান করেন বিধায়। লেনদেন এর ক্ষেত্রে তাদের মার্কেটশেয়ার আনুপাতিক হারের সমান নয়।

নারী উদ্যোক্তাদের পুঁজি সংকট, কাজের পরিবেশ, সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক দক্ষতার যে অভাব রয়েছে তা ক্রমশ কাটিয়ে উঠছে। এজন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার ইতোমধ্যে সকল তফসিল ব্যাংকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সহজীকরণ, সরকারী প্রণোদনা, বিনামূল্যে নানাবিধ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে নারীদেরকে সমস্যার বৃত্ত থেকে বের করে আনার জন্য কাজ করছে।

নারী উদ্যোক্তাদের পেশাদার উদ্যোক্তা হিসেবে মূলধারারা উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে করে কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠান বা বৃহৎ উদ্যোগের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা ঝরে না পড়েন।  সূতরাং চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উই সব সময় তাদের সাথে থাকবে।

 

লেখক:

ই-কমার্স  অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক

এবং

বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন এর সাধারণ সম্পাদক

 

602 total views, 5 views today

Comments

comments