আমি প্রতিদিন ই-ক্যাব নিউজ এ লিখি। লেখার জন্যে ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘাটতে হয়। ব্রাউজ করতে করতে হাফিংটন পোস্টে এ প্রবন্ধটি  চোখে পড়ল। চীনের মোবাইল কমার্সের উপরে লেখা। লেখাটি ই-ক্যাব ব্লগের পাঠকদের জন্যে ইংরেজি থেকে সরাসরি অনুবাদ করে দিলাম।  প্রবন্ধটির লেখক ডেভিড ইন বর্তমানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন।

“যুক্তরাষ্ট্রে ই-কমার্স মানে অনলাইন শপিং কিন্তু চীনে ই-কমার্স হচ্ছে লাইফস্টাইল”এ উক্তিটি জনপ্রিয় চীনা ই-কমার্স ওয়েবসাইট আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা’র। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আলিবাবা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তাদের আইপিওর মাধ্যমে ২৫ বিলিয়ন ডলার পুঁজি  সংগ্রহ করে যা যুক্তরাষ্ট্রের আইপিওর ক্ষেত্রে এক নতুন রেকর্ড। আলিবাবার এ উত্থান চীনের ইন্টারনেট এবং ই-কমার্সের ব্যাপক উত্থানের এক অনবদ্য প্রতিফলন। ২০১৬ সাল নাগাদ চীনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৭৩ কোটি এবং এর মধ্যে ৩৮ কোটি লোক অনলাইনে শপিং করবে। ২০১০ সালে এ পরিসংখ্যানটি ছিল ৪৬ কোটি এবং ১৪কোটি ৫০ লক্ষ।

চীনে ই-কমার্স বৃদ্ধির মূল কারণ দুটি। প্রথমত,  বিগত কয়েক বছরে সরকার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। দ্বিতীয়ত, দেশটিতে রিটেইল সেক্টর তেমন উন্নত নয়। ফলে এখানে শপিং মল বা ভাল দোকানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে অনলাইন শপে বিভিন্ন ধরণের পণ্যের বিশাল সমাহার রয়েছে এবং দামেও কম ও কেনাকাটা করাও আরামদায়ক। এ বছরেই চীনের ই-কমার্স বাজারের মূল্য হবে দেশটির মোট রিটেইল বাজার মূল্যের ৭.৪% এবং শহরাঞ্চলের জনগণের অর্ধেক অনলাইনে কেনাকাটা করবে। এর ফলে চীন হয়ে উঠবে বিশ্বের বৃহত্তম ই-কমার্স বাজার।

ই-কমার্সের মধ্যে মোবাইল কমার্স (এম-কমার্স)এখন চীনের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উথান হচ্ছে। এর পেছনে কারণ হচ্ছে স্মার্টফোনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা। কম দামে এখন খুব ভাল মানের স্মার্টফোন পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে চীনে মোট নতুন ফোন বিক্রীর ৮০% স্মার্টফোন এবং দেশটি এখন বিশ্বের বৃহত্তম স্মার্টফোন বাজার। চীনের সাধারণ মানুষরাও এখন মোবাইল ডিভাইসে শপিং এর স্বাদ পেয়ে গিয়েছে। তারা যেকোন সময়ে যে কোন জায়গা থেকে পণ্য ক্রয় করতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা পরিবহনে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করার সময়ে মোবাইল শপিং করে থাকে। চীনের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ৬৯% তাদের ফোনের মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই পরিসংখ্যান ৪৬%। চীনের তিনটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান- চায়না মোবাইল, চায়না টেলিকম এবং চায়না ইউনিকম তাদের নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করতে বিশাল বিনিয়োগ করেছে।গত বছরের জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠান তিনটি সম্মিলিতভাবে দেশজুড়ে চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কোটি কোটি ব্যবহারকারী উন্নতমানের মোবাইল ব্রডব্যাণ্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করতে সক্ষম হবে।

মোবাইল শপিং এবং মোবাইল পেমেন্ট একে অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেমের ঊর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তা মোবাইল কমার্সের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির আরেকটি প্রধান কারণ। ২০১০ এর জুন মাস থেকে পিপল’স ব্যাঙ্ক অভ চায়না দু’শর বেশি অ-আর্থিক (Non-Financial) প্রতিষ্ঠানকে থার্ড-পার্টি পেমেন্ট সেবা প্রদানের লাইসেন্স প্রদান করেছে এবং মোবাইল পেমেন্টের একটি জাতীয় মানদণ্ড ঘোষণা করেছে। এ দুটি ঘটনার কারণে চীনে মোবাইল পেমেন্ট মার্কেট খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে মোবাইল পেমেন্ট বাজার বিগত বছরের তুলনায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১.৪৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ২২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

স্মার্টফোন সহ মোবাইল ডিভাইসের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং মোবাইল পেমেন্ট বাজারের বৃদ্ধির ফলে চীনের মোবাইল কমার্স সেক্টর বিশাল আকার ধারণ করেছে। ২০১১ সালে মোবাইল কমার্সের বাজার ছিল ১২ বিলিয়ন ইউয়ান বা ১.৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৮ বিলিয়ন ইউয়ান বা ১৩২ বিলিয়ন ডলার যা ছিল  দেশটির মোট ই-কমার্স বাজারের এক পঞ্চমাংশ। আইরিসার্চ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মতে, আগামী বছরে চীনের মোবাইল কমার্সের বাজার বেড়ে দাঁড়াবে ২.৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ৪০০ বিলিয়ন ডলার যা কিনা মোট অনলাইন রিটেইলের অর্ধেকের বেশি হবে। খুবই দ্রুত চীনে মোবাইল সাধারণ মানুষের পণ্য ও সেবা ক্রয়ের একটি গুরুত্ব প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে।

পুনঃভারসাম্য রক্ষার অনুঘটক

চীনের জাতীয় উন্নয়ন এবং সংস্কার কমিশন তাদের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশটির অর্থনীতি পুনঃবিন্যাসের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যার মধ্যে আছে স্থানীয় ভোক্তা উন্নয়ন, সেবাখাত উন্নয়ন, বেতন বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস এবং উঠতি ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন।

মর্গ্যান স্ট্যানলি এশিয়ার প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্টিফেন রোচ এর মতে মোবাইল-কমার্সের উত্থান চীনকে রপ্তানি ও বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতি থেকে ভোক্তা-চালিত অর্থনীতিতে (Consumer Driven Economy) রূপান্তরিত হবার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। একই সাথে মোবাইল কমার্স দেশটির স্বস্তা শ্রম সেক্টরকে (ম্যানুফ্যাকচারিং এবং কন্সট্রাকশন) উন্নতমানের শ্রমবাজারে পরিণত করবে (মূল্য সংযুক্ত সেবা)।

ই-কমার্স এবং এম-কমার্স চীনের স্বল্পোন্নত এবং অপর্যাপ্ত রিটেইল খাতের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং দেশটির ভোক্তাদের ব্যয় ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করবে। চীনের ছোট ছোট শহরগুলোর জন্যে এটি খুবই সত্যি। এসব শহরগুলোতে দোকানে বিভিন্ন ধরণের পণ্য নেই এবং মোবাইল ডিভাইস হচ্ছে এসব ভোক্তাদের অনলাইনে পণ্য কেনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।  ম্যাককিন্সির একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে কম আয় স্বত্বেও চীনের টিয়ার-৪ পর্যায়ের শহরের ভোক্তারা টিয়ার-২ এবং টিয়ার-৩ লেভেলের ভোক্তারা অনলাইন শপিং-এ যে পরিমাণ টাকা ব্যয় করেন তার প্রায় সমান টাকা ব্যয় করেন। টিয়ার-২ এবং টিয়ার-৩ পর্যায়ের শহরের ভোক্তাদের আয় অনেক বেশি।

বর্তমানে চীনের ভোক্তাদের ই-কমার্স এবং এম-কমার্সে খরচের ৬১% প্রথাগত দোকান এবং মার্কেটে পণ্য কেনার বিপরীতে ঘটেছে। অর্থাৎ ক্রেতারা দোকানে না গিয়ে ওয়েবসাইট এবং মোবাইল ডিভাইস থেকে পণ্য কিনছে। বাকী যে ৩৯% খরচ তা হচ্ছে ভোক্তাদের বেশি বেশি পণ্য কেনার ফলাফল। মানে অনলাইনে ক্রেতারা আরও বেশি পণ্য কিনছেন। একে বলা হচ্ছে বর্ধিত ভোগ বা Incremental Consumption। ২০১১ সালে চীনের ভোক্তাদের ব্যক্তিগত ভোগ (Private Consumption)এর পরিমাণ ছিল ২%। ২০২০ সাল নাগাদ অনলাইন শপিং এর কারণে ব্যক্তিগত ভোগ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭% এ।

এ বছরের মার্চে চীনে দ্বাদশ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে চীনের প্রিমিয়ার লি কিয়াং “ইন্টারনেট প্লাস” কৌশল প্রণয়নের ঘোষণা প্রদান করেন। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশটির প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। মোবাইল কমার্স সেক্টরের বিস্তৃতি ঘটলে চীনে কর্মসংস্থানের হার,  চাকুরেদের আয় এবং সেবা খাত আরো বৃদ্ধি পাবে। আগামী কয়েক বছরে অনলাইন রিটেইল সেক্টরে প্রায় ৩০ লক্ষ দক্ষ লোকের চাকুরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রথাগত দোকান বা শপিং মলের বেশিরভাগ কর্মীরাই কম শিক্ষিত যার কারণে তাদের বেতন কম। কিন্তু অনলাইন রিটেইল সেক্টরে যারা কাজ করবে তারা সকলেই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রীধারী বিধায় তাদের বেতন হবে বেশি। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটের বেকারত্বের হার অনেকাংশে কমে যাবে। বর্তমানে চীনে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার ১৬.৪%।

জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ই-কমার্স সেক্টরের কেস স্টাডির উপরে ভিত্তি করে চীনের ই-কমার্স এবং এম-কমার্স খাত তাদের কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যারে বিনিয়োগ করে। যেমন- বড় বড় শহরগুলোতে বেশিরভাগ ই-কমার্স এক্সপ্রেস ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান এখন আধা-স্বয়ংক্রিয় সর্টিং সেন্টার ব্যবহার করা শুরু করেছে। অনলাইন রিটেইলের কারণে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি যেমন-মার্কেটিং, অনলাইন বিজ্ঞাপন, পেমেন্ট সিস্টেম, লজিস্টিক্স, ডেলিভারি, আইটি সেবা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে।

মোবাইল ডিভাইসের ঊর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তা, মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেম খাতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কারণে অদূর ভবিষ্যতে চীনের মোবাইল-কমার্স সেক্টর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে এবং প্রথাগত রিটেইলকেও অনেকগুণে ছাড়িয়ে যাবে। এর ফলে দেশ ও দেশের বাইরে নতুন বাজার সৃষ্টি হবে যা  চীনের অর্থনীতিতে ভারসাম্য নিয়ে আসবে।

স্টিফেন রোচের আরেকটি উক্তি দিয়েই এ লেখাটি শেষ করছি । “চীনে আর নতুন করে ইটের দোকান তৈরি করার দরকার নেই। অনলাইন মল ভার্চুয়াল এবং অনেক লোক এমলে কেনাকাটা করে।”

সূত্রঃ

হাফিংটন পোস্ট

909 total views, 3 views today

Comments

comments