মার্কেটিং প্লান এর প্রধান ৯টি কৌশল

23250
মার্কেটিং প্লান এর প্রধান ৯টি কৌশল

মার্কেটিং প্লান এর প্রধান ৯টি কৌশল

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আমাদের দেশে বেশীরভাগ উদ্যোক্তা যেমন পরিকল্পনাবিহীনভাবে ব্যবসায় শুরু করেন। তেমনি তারা বিপনন এর কাজটিও অগোছালোভাবে করেননা। ব্যবসায় শুরু করেন নিজে কিছু একটা করতে চান বলে, অথবা চাকরী করতে চান না বলে অথবা চাকরী খুঁজে পান না বলে। কিন্তু শুধু এই কারণে ব্যবসায় করা যায়না। ব্যবসায়ের জন্য আরো অনেকগুলো কারণ দরকার হয়। যেমন আমি যে ব্যবসায় করতে চাই, তার চাহিদা কেমন? আমি নিজে ব্যবসায়টা বুঝি কিনা? আমার প্রতিযোগী ব্যবসায়ীরা কেমন? ইত্যকার নানা বিষয়?

আবার বিপনন  বা মার্কেটিং এর সময় দেখতে হয়। আমার কাস্টমার কারা হবে? তাদের রুচি ও ক্ষমতা কেমন? আমার পন্যপ্রতি লাভ কেমন হবে? কত শতাংশ বিনিয়োগ আমি বিপনন বা মার্কেটিং এর জন্য খরচ করবো।

আসুন এ সম্পর্কে কিছু ধারণা শেয়ার করার চেষ্টা করি।

 

১. বাজার যাচাই বা আরএনডি

রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট এর কথা আমরা একেবারে ভুলেই যাই। বিশ্বের বড়ো বড়ো কোম্পানী ব্যবসায় নামার আগে একাজে কোটি কোটি ডলার খরচ করে থাকে। আমাদেরতো কোটি ডলার নেই। তাই বলে আমরা মিনিমাম একটা বাজার যাচাই করবো না?। যে পন্যটা নিয়ে ব্যবসায় করবো। সেটা কিভাবে উৎপাদন বন্টন ও বিক্রি হয়?  তা সরেজমিনে শিখে আসতে পারি। যারা এই পন্যটি ব্যবহার করে তারা এখন কার পন্য কেন ব্যবহার করছে তার সুবিধা অসুবিধা কি? একটা ফরম বানিয়ে হাজার খানেক লোককে প্রশ্ন করে দেখতে পারি। পাবলিক কি চায়? অনলঅইনে এসংক্রন্ত তথ্য ও লেখা পড়তে পারি। এমনকি কয়েকজন সফল এবং ব্যর্থ লোকের সাথে কথা বলতে পারি। তারা কেন সফল বা ব্যর্থ হলো?

 

১. শুরুর পরিকল্পনা বা প্রিমিয়ার স্ট্রেটিজি

আপনি যখন ব্যবসায়ের পরিকল্পনা করছেন সেখানে নিশ্চয় বাজেট বা বিনিয়োগ এর প্লান থাকে। সেখানে হয়তো এমন একটা চিত্র থাকবে। আপনি কোন খাতে কত টাকা বা কত শতাংশ বিনিয়োগ করতে চান।

ব্যবসায় ধরণ অনুসারে আপনার মোট বিনিয়োগের ২০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে প্রচারণা বা মার্কেটিং এর জন্য খরচ করতে পারেন। পরবর্তীতে এই কৌশলে সময়ে সাথে পরিবর্তন করতে হবে। সেগুলো পরবর্তী ধাপে আলোচনা করা হচ্ছে। অনেক কোম্পানী রয়েছে একবছর, তিনবছর এমনকি পাঁচবছর পর্যন্ত প্রচার প্রসারে বিনিয়োগ করে থাকেন। এটা তার বিজনেস এর কৌশল। তিনি হয়তো লং রানে বড়ো কিছু করার প্লান নিয়েছেন।

 

২. চলমান ব্যবসায়ে বিপনন পরিকল্পনা বা অনওয়ে স্ট্রেটিজি

আপনি ব্যবসায় শুরু করেছেন। কয়েক মাস বা বছর হয়ে গেছে। বেচা বিক্রিও হচ্ছে আবার কমবেশী লাভও হচ্ছে। তাই বলে খুশি হওয়ার কিছু নেই। কারণ সেলস যেরকম একটা চলমান বিষয়। ব্রান্ডিং কিংবা মার্কেটিংও তাই। এটা সব সময় চালু রাখতে হয়। এখন চালু রাখার জন্য আপনার খরচের কৌশল কি হতে পারে।

আপনার যেহেতু ব্যবসায়টা রানিং। তাহলে আপনার কিছু খরচও রানিং। যেমন অফিসভাড়া, ইউটিলিটি বিল, স্টাফের বেতন ইত্যাদি। সূতরাং মার্কেটিং এর জন্যও আপনার নিয়মিত একটা খরচ থাকবে। সেটা আপনার মোট খরচের কত শতাংশ হবে সেটা নির্ভর করছে আপনি পন্যটি বিক্রি করে কত টাকা লাভ করবেন বা করতে পারবেন তার উপর। আপনি বিপনন কার্যক্রম না করে পন্য খুব কমদামে বিক্রি করলেন কিন্তু সেটা মানুষ জানলো না বা পন্য বিক্রি হলো না, তাহলে যেমন ঝুকি রয়েছে। আবার আপনি বিপননে অধিক টাকা খরচ করে পন্যের দাম বাড়িয়ে দিলেন ফলে পন্যটি বাজারে বিক্রি হলো না। দুটোর কোনোটাই যেন না হয়।

৩. ইনভেস্টমেন্ট স্ট্রেটিজি

অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসায়ের লাভ হওয়ার ফলে প্রতি বছর নতুন করে বাড়তি বিনিয়োগ করে থাকেন। অথবা লোকসান হওয়ার ফলে কিছু পলিসি পরিবর্তন করে আবার বিনিয়োগ করে থাকেন। সেক্ষেত্রে মার্কেটিং বা প্রমোশনাল বাজেটও এর বাইরে নয়। নতুন করে পরিকল্পনা করে আবার বিনিয়োগও মার্কেটিং করে থাকেন।

৪. রেশিও স্ট্রেটিজি

এ ই ধরনের কৌশলে একটা রেশিও ধরে প্রমোশন বাজেট সেট করা হয়। সেটা পন্যের ক্রয়মূল্য অথবা বিক্রয়মূল্য এর সাথে সমন্বয় করা হয়। এতে পুরো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের লাভ লোকসানকে সরাসরি প্রভাবিত করে না। যেমন একটি কোম্পানী একটি ট্যুর প্যাকেজ ডিজাইন করলো। প্রতিটি প্যাকেজে কোম্পানীর খরচ ১০ হাজার টাকা। কোম্পানী দুই হাজার টাকা পন্যপ্রতি লাভ ধরে অথবা ২০% লাভ হিসেব করে এর দাম ঠিক করলো ১২ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে মাসে কয়টি পন্য বিক্রি হবে কতটাকা খরচ হবে। লাভ ক্ষতির অন্যান্য হিসেবটাও একবার মিলিয়ে নিতে হয়।

৫. প্রফিট বেজড স্ট্রেটিজি

কোনো কোনো কোম্পানী প্রফিটের উপর ভিত্তি করেও মার্কেটিং প্লান সেট করতে পারেন। বিশেষকরে যারা মার্কেটে শক্ত ভিত্তির উপর দাড়িয়ে গেছে তাদের জন্য একৌশল ভালো। যেমন আমার মাসে যত টাকা লাভ হয়। বা বছরে বা দৈনিক বা পন্যপ্রতি কতটাকা লাভ হয়। সেখান থেকে ২০ বা ৪০ শতাংশ আমি বিজ্ঞাপনের জন্য খরচ করবো।

৬. ব্রান্ডিং ফ্রেন্ডলী স্ট্রেটিজি

এটা বড়ো বড়ো কোম্পানীগুলো এপ্লাই করে থাকে। আপনারা যখন টিভিতে এড দেখেন যে একটি মোবাইল অপারেটর প্রতি মাসে বা সপ্তাহে নানা রকম অফার নিয়ে আসে। এটা জানা কথা যে এইসব অফার জনপ্রিয় হয়না বা লাভজনক হয়না। কোনো অপারে এড এর দামটাও উঠে না। কিন্তু হয়তো বছর শেষে কোম্পানী লাভজনক থাকে। কারণ কোনো কোনো এড এ কোম্পানীর প্রোডক্টস সেল না হলেও কোম্পানীর প্রমোশন হয়েছে। কোম্পানী ভোক্তাদের মানসজগতে দখল বজায় রাখতে পেরেছে। যদি তা না হতো শুধু যেসব অফার ভালো চলে সেগুলোর জন্য এড করা হতো আর যেগুলো চলে না সেগুলোর এড বাদ দেয়া হতো তাহলে তাদের প্রমোশন কমে যেত অথবা যদি সে অল্প কয়টি অফারের এডই প্রচার করা হতো তাহলে বার বার একই এড মানুষের ভালো লাগতোনা।

 

৭. সাপোর্ট স্ট্রেটিজি

কখনো কখনো ব্যবসায়ের মাঝ পথে। বিশেষ কোনো কারণে সেটা বাজার ধরার জন্য বা নতুন পন্য বাজারে ছাড়ার জন্য বা অফার দেয়ার জন্য একটি বিশেষ বাজেট ও প্লান করা হয়ে থাকে। সে প্লানের আওতায় রেগুলার বাজেটের চেয়ে বাড়তি বাজেট দিয়ে প্রমোশন বা মার্কেটিং এর জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

 

৮. রিফর্ম স্ট্রেটিজি

কখনো দেখা যায়। কোম্পানীর বয়স অনেকদিন হয়ে গেছে। কোম্পানীর সব কিছু পুরনো মনে হচ্ছে। বা পুরনো ইমেজে কোম্পানীর ব্যবসায় ভালো যাচ্ছে না। তখন দেখা হলো কোম্পানী তার নাম বা লোগো বা বিজনেস কালার বা এড সেন্স বা মার্কেটিং কৌশল পরিবর্তন করে থাকে। এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও কনজুমারদের দৃষ্টি ফেরানোর জন্য বিশেষ বাজেট পাস করে তা বাস্তবায়ন করা হয়। বাংলাদেশের শীর্ষ কয়েকটি কোম্পানী জনপ্রিয়তা থাকা স্বত্বেও এটা করেছে। লিভার বাদ্রার্স নাম বদলে হয়েছে ইউনিলিভার। গ্রামীণফোন বদলালো তাদের লোগো এবং লাল সবুজ বিজনেস কালার বদলিয়ে করলো সায়ান। আর একটেল হয়ে গেলো রবি নাম ও লোগোসহ। কখনো ব্যবসায়িক পলিসিপরিবর্তন হলেও এগুলো করতে হয় যাতে করে জনসাধারণ এর কাছে পরিবর্তনের মেসেজটা পৌছায়। যেমন বাংলাদেশ শিল্পব্যাংক হয়ে গেলো বাংলাদেশে ডেভলপমেন্ট ব্যাংক আর এখানেই ডট কম হেয়ে গেলো বাগডুম।

৯. অন্যান্য

এই বাইরে আরো বেশকিছু কৌশল রয়েছে। যেগুলো ব্যবসায়ীরা প্রয়োগ করে থাকেন। এর মধ্যে একটা হলো তার কি পরিমাণ সেল প্রয়োজন সে অনুসারে তিনি ঠিক করেন কতটাকার প্রমোশান চালাবেন। অথবা তার সেলস টিম কত টাকা সেল করতে পারবে। বা তার উৎপাদন বিভাগ কতটাকার পন্য উৎপাদন করতে পারবে। তার ভিত্তিতেও কৌশল ঠিক করা হতে পারে।

 

Comments

comments

About The Author



Freelance Consultant, Writer and speaker . Jahangir Alam Shovon has been in Bangladeshi Business sector as a consultant, He has written near about 500 articles on e-commerce, tourism, folklore, social and economical development. He has finished his journey on foot from tetulia to teknaf in 46 days. Mr Shovon is social activist and trainer.

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *