ভারতে ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করতে চালু হয়েছে ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেইস (ইউপিআই)

1087

এই বিষয়টা অনেক আগেই একটা পোস্ট লেখার ইচ্ছা ছিল কিন্তু লেখব লেখব করেও করা হয়ে ওঠেনি। এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এর অধীনস্থ ন্যাশনাল পেমেন্ট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনপিসিআই) ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেইস (ইউপিআই)চালু করেছে। ভারতে যত পেমেন্ট সিস্টেম আছে সবগুলি এনপিসিআই এর তত্ত্বাবধানে আছে। এ বছরের এপ্রিল মাসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পরীক্ষামূলকভাবে ইউপিআই চালু করে এবং সেপ্টেম্বরে পুরোপুরিভাবে চালু করে দেয়।

বর্তমানে ভারতে ১৫ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী আছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এটি ৫০ কোটিতে পৌছাবে। ইউপিআই স্মার্টফোন নির্ভর। ইউপিআই এর কারণে ভারতের জনগণকে আর কষ্ট করে ডেবিট/ক্রেডিট বা অন্য কোন কার্ড বা ওয়ালেট  ব্যবহার করা লাগবে না। যাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে এবং স্মার্টফোন আছে তারা সহজেই নিজেদের স্মার্টফোন দিয়ে পেমেন্ট করতে পারবেন। ভিসা মাস্টারকার্ড ব্যবহার করলে লেনদেন পিছু যে হারে টাকা কাটা হয় তার থেকে কম হারে টাকা কাটা যাবে ইউপিআইতে।

কিভাবে ইউপিআই কাজ করে?  

ইউপিআই এর ফলে এখন সাধারণ মানুষ তাদের স্মার্টফোনের মাধ্যমে এক ব্যাঙ্ক থেকে অন্য ব্যাঙ্কে টাকা ট্রান্সফার বা একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য একজনের অ্যাকাউন্টে খুব সহজে টাকা ট্রান্সফার করা যাবে। বর্তমানে ভারতে যেসব জনপ্রিয় পেমেন্ট সিস্টেম আছে যেমন- ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (এনইএফটি), ইমিডিয়েট পেমেন্ট সার্ভিস (আইএমপিএস), রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) এসব সিস্টেমে একজন ব্যবহারকারীকে প্রথমে একটি ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করতে হয় এবং তাদের অ্যাকাউন্টের তথ্য দিতে হয়। কিন্তু ইউপিআইতে এতসব ঝামেলার প্রয়োজন নেই। ব্যবহারকারীগুগল প্লে স্টোর থেকে ইউপিআই অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করে একটি ভার্চুয়াল পেমেন্ট অ্যাড্রেস (ভিপিএ) তৈরি করবে। গুগল প্লে স্টোরে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের ইউপিআই অ্যাপ্লিকেশন আছে। ব্যবহারকারীর যে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে সেই ব্যাঙ্কের ইউপিআই ব্যবহার করবে। এটা হতে পারে তার মোবাইল ফোন নম্বর বা তার ইউনিক মেইল অ্যাড্রেস। ব্যস হয়ে গেল, এর পরে উক্ত ব্যবহারকারী যে কোন অ্যাকাউন্টে টাকা প্রেরণ বা গ্রহণ করতে পারবে।

1

কোন একজন ব্যবহারকারীর যদি একাধিক ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকে তাহলে সে একাধিক ইউপিআই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে। ধরা যাক, এক লোকের ভারতের অ্যাকসিস ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে। আবার কোটাক মাহিন্দ্র ব্যাঙ্কেও অ্যাকাউন্ট আছে। সে চাইলে দুইটি ইউপিআই অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে পারবে।

ধরা যাক, একজন ইউপিআই ব্যবহারকারী তার বাসার কাছে দোকানদার থেকে জিনিসপত্র ক্রয় করেছেন। উক্ত দোকানদার সেই ক্রেতার ভার্চুয়াল ঠিকানা বরাবর একটি রিকোয়েস্ট পাঠাবেন। উক্ত ক্রেতা খালি “Ok” অপশন ক্লিক করে নিশ্চিত করবেন যে হ্যা এটা ঠিক আছে এবং ব্যাক এন্ডে যে ব্যাঙ্ক কাজ করছে সে সাথে সাথে পেমেন্ট ক্লিয়ার করে দেবে। একই ভাবে টাকা আদান-প্রদান করা যায়।

এখানে এনপিসিআই একটি কেন্দ্রীয় সুইচ হিসেবে কাজ করে। এনপিসিআই একজন ব্যবহারকারীর ভার্চুয়াল পেমেন্ট অ্যাকাউন্ট (ভিপিএ) তৈরি করবে এবং বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের  যাবতীয় লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ করবে।

অন্যান্য পেমেন্ট সিস্টেমস এর সাথে তুলনা:

ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (এনইএফটি) এর একটা বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে যে এ পন্থায় লেনদেন করার জন্যে প্রতিবার একজন ব্যবহারকারীকে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত তথ্য দিতে  হয় কিন্তু ইউপিআই পদ্ধতিতে এর প্রয়োজন নেই। এছাড়াও এ পন্থায় বেশি টাকা লেনদেন করা যায় না। ছুটির দিনে এনইএফটি কাজ করে না কিন্তু ইউপিআই দিয়ে ২৪ ঘন্টা, ৩৬৫ দিন লেনদেন করা যাবে।

আইএমপিএস  এ লেনদেন করতে গেলে প্রতিবার ১১ ডিজিটের ইন্ডিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম (আইএফএস) কোড দিতে হয়। কিন্তু ইউপিআই এ ভার্চুয়াল পেমেন্ট অ্যাড্রেস ব্যবহার করে বার বার এত তথ্য দিতে হয় না।

ভারতে মোবাইল ওয়ালেট এখন বেশ জনপ্রিয় বর্তমানে ২০টির বেশি মোবাইল ওয়ালেট ভারতে সেবা দিচ্ছে আছে। এসব ওয়ালেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এগুলো ইন্টার-অপারেবল নয়। তাই সীমিত ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার করা যায়। সব ব্যাঙ্ক বা দোকান সব ধরণের মোবাইল ওয়ালেট সাপোর্ট করে না। আবার এক মোবাইল ওয়ালেট থেকে আরেক মোবাইল ওয়ালেটে বা ওয়ালেট থেকে ব্যাঙ্কে টাকা লেনদেন করা যায় না।

মোবাইল ওয়ালেট ব্যবহার করার জন্যে ব্যবহারকারীকে ব্যাঙ্ক থেকে আগে ওয়ালেটে টাকা ভরতে হবে। প্রিপেইড মোবাইল ওয়ালেটে এক সাথে সর্বোচ্চ দশ হাজার রুপি পর্যন্ত লেনদেন করা যায় যেখানে ইউপিআই এ এক লক্ষ রুপি পর্যন্ত লেনদেন করা যায়। ইউপিআই এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটা ব্যবহার করার জন্যে ব্যবহারকারীর খালি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলেই হবে। তাকে আবার কষ্ট করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে ইউপিআই এ টাকা ভর্তি করা লাগবে না। এটার জন্যে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই। এটি একটি ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্ম যার স্মার্টফোনের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায় এবং একের অধিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এর সাথে যুক্ত হতে পারে।

ইউপিআই এর মাধ্যমে অনলাইনেও কেনাকাটা করা যাবে। ইউপিআই এর মাধ্যমে যত লেনদেন হয় সেগুলো টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিফিকেশন সাপোর্ট করে। প্রথম ফ্যাক্টর হচ্ছে মোবাইল ফোন এবং দ্বিতীয় ফ্যাক্টর হচ্ছে মোবাইল পিন নম্বর।

ইউপিআই এর আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে দোকান বা শপিং মল গুলোতে বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা মোবাইল ওয়ালেট ব্যবহার করে লেনদেন করতে গেলে সোয়াইপ মেশিন, পয়েন্ট-অব-সেলস টার্মিনাল (পিওএস) ইত্যাদি বসান লাগে যা বেশ ব্যয়বহুল কিন্তু ইউপিআই এ এসব কোন মেশিন বা কিছুর দরকার নেই। দোকানদারের কাছে একটি স্বস্তা স্মার্টফোন থাকলেই হয়। যে কোন ধরণের লেনদেন সে করতে পারবে এবং ব্যাঙ্ক ব্যাক এন্ডে সব সেবা দেবে। এর ফলে খুব সহজে কম খরচে মার্চেন্ট অ্যাকুইজিশন করা যাবে।

ইউপিআই এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটার ইউজার ইন্টারফেইস উন্মুক্ত অর্থাৎ যে কোন ব্যাঙ্ক তাদের সুবিধা মতো তাদের ইউপিআই অ্যাপ্লিকেশনের ইউজার ইন্টারফেইস তৈরি করে নিতে পারবে।

 

বর্তমানে ২৯টি ব্যাঙ্ক ইউপিআই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যার মধ্যে আছে স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক সহ আরো অন্যান্য ব্যাঙ্ক। বর্তমানে শুধুমাত্র ব্যাঙ্ক গুলো ইউপিআই ব্যবহার করছে কিন্তু আস্তে আস্তে মোবাইল ওয়ালেট গুলোকেও এর সাথে যুক্ত করা হবে।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ :

এমন নয় যে বাংলাদেশ এই ব্যাপারে পিছিয়ে রয়েছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) চালু করে। এটি করার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল যে এটিএম, পিওএস, ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং, মোবাইল ব্যাঙ্কিং এসব খাতের যে লেনদেনগুলো হয় সেগুলোকে একটি কমন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা ঠিক ইউপিআই এর মতো। এনপিএসবি তৈরি করাই হয়েছে দেশে ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্যে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫১টি ব্যাঙ্ক কার্ড পেমেন্ট সেবা দেয় যার মধ্যে ৪৯টি ব্যাঙ্কের ইন্টারব্যাঙ্ক এটিএম লেনদেন এবং ৪১টি ব্যাঙ্ক এর পিওএস লেনদেন এনপিএসবি এর মাধ্যমে হয়ে থাকে। এখানে এ বছরের জুলাই এবং আগস্ট মাসে এনপিএসবিতে সম্পাদিত লেনদেনের একটি তুলনামূলক চার্ট দেয়া হলো।

2

এ বছরের শুরুতে দৈনিক পত্রিকা দ্যা ডেইলি স্টার “Payment Ecosystem in Bangladesh: Challenges and Opportunities” শীর্ষক একটি গোলটেবিলের আয়োজন করে যেখানে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক সহ প্রাইভেট ব্যাঙ্কের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। গোলটেবিল আলোচনায় তারা এনপিএসবি এর বেশ কিছু দূর্বলতার কথা তুলে ধরেন। বলা হয় যে এনপিএসবি তে নিরাপত্তা একটি বড় সমস্যা কারণ এনপিএসবি ম্যাগনেটিক স্ট্রাইপ সম্বলিত ক্রেডিট কার্ডের ডাটা প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে কিন্তু মাইক্রোচিপ সম্বলিত ক্রেডিট কার্ডের ডাটা প্রসেস করতে পারে না। বর্তমানে বিশ্বের সবজায়গায় মাইক্রোচিপ ডাটা সম্বলিত কার্ড চালু হয়েছে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই মাইক্রোচিপ সম্বলিত কার্ড ছাড়া হয়েছে। আরো বড় সমস্যা হচ্ছে, কার্ডে কোন ধরণের ফ্রড হলে কিভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি হবে তা নিয়েও কোন সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই।

আরো একটি দূর্বলতা যেটি আলোচনায় উঠে আসে তা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক এর অবকাঠামো পিসিআই সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ড কাউন্সিল এর সাথে কমপ্লায়েন্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক PCI Security Standards Council একটি উন্মুক্ত গ্লোবাল ফোরাম। অ্যাকাউন্ট এর তথ্যের নিরাপত্তার জন্যে এই স্ট্যান্ডার্ড ফলো করা হয়।

বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্ট জনপ্রিয় নয় যেটা ই-কমার্সের পূর্বশর্ত। যদি আমাদেরকে ই-কমার্স জনপ্রিয় করতে হয় তাহলে নিরাপদ এবং ঝঞ্ঝাটবিহীন পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে এবং সে লক্ষ্যে এনপিএসবিকে উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

সূত্রঃ

দ্যা হিন্দু

লেটস টক পেমেন্টস

দ্যা ট্রিবিউন

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

দ্যা ইকনোমিক টাইমস

টেক প্রিভিউ

দ্যা ডেইলি স্টার

Bangladesh Bank (1)

Bangladesh Bank (2)

Comments

comments

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *