ভারতে অনলাইন মার্কেটপ্লেস এর চ্যালেঞ্জ : আমাদের শিক্ষণীয়

2115

এই পোস্টটি গত সোমবার (জানুয়ারি ১৬, ২০১৭) ই-ক্যাব ফেইসবুকগ্রুপে একজন লিখেছেন। তিনি আমার পরিচিত। তার নিজস্ব অনলাইন স্টোর ছিল পরে তিনি সেটি বন্ধ রেখে এখন আরেকটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করছেন। মনযোগ দিয়ে পোস্ট টি পড়ুন আগে-

যারা হাজারটা ক্যাটেগরির প্রোডাক্ট শোরুমে ধুমছে সেল করছে, তারাই আবার হতাশা ভরা মুখ নিয়ে ই-কমার্সের গ্লানি টানছে। আরে ভাই কারো নিজের ই-কমার্স থাকলেই কি সে ই-কমার্স প্রফেশনাল হয়ে যায়!!! আরেক বিশাল কোম্পানি ই-কমার্সের হেড খুঁজে মিনিমাম ১০ বছরের এক্সপিরিয়েন্স বয়স মিনিমাম ৪০ এবং এমবিএ থাকতে হবে , আরে ভাই ই-কমার্স বাংলাদেশে আসলো কবে যে এতো স্কিল রিসোর্স পাওয়া যাবে!!! কারো আবার স্বপ্নটা আকাশ ছোঁয়া কিন্তু সাধ্যটা সামান্য। হতে চায় দারাজ কিন্তু দিন শেষে হয় এফ-কমার্স।কেউ কেউ না বুঝেই বড় কম্পানির ভুল ধরা নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু একবার হিসাব করেনা যেই প্রতিষ্ঠান মাসে ২০ লক্ষ টাকা অপারেশনের জন্য খরচ করে সে কি, প্রোডাক্ট বেচে লাভের আশায় ই-কমার্স করে !!! সবাই সব কিছুই জানে, কিন্তু অধিকাংশই জানার চেষ্টা করেনা প্রতি মাসের কত টাকা প্রফিট করলে প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে এবং কিভাবে এই প্রফিট জেনারেট করতে হবে। সবাই বিভিন্ন মার্কেট থেকে প্রোডাক্ট সোর্স করে, কিন্তু কাল যদি সেই মার্কেট নিজেই অনলাইনে চলে আসে তার প্রস্তুতি আছে তো !!!! ই-কমার্স এগিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি কতটুক !!!

এই পোস্ট টি প্রকাশ করার ঠিক চারদিন পরে ভারতের দ্যা ইকনোমিক টাইমস তাদের সবচেয়ে বড় তিনটি প্রতিষ্ঠান- ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন ইন্ডিয়া এবং স্ন্যাপডিল নিয়ে দুটি লেখা প্রকাশ করে। লেখা দুটি পড়ে আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোও এই ধরণের চ্যালেঞ্জ ইতিমধ্যেই ফেইস করছে বা অদূর ভবিষ্যতে করবে।

ভারতে ই-কমার্স নিয়ে অনেক লেখাজোকা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স বাজারগুলোর একটি। বড় বড় ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং ফার্ম, রিসার্চ ফার্ম- ফরেস্টার রিসার্চ, ডেলয়েট, সহ নানা ধরণের প্রতিষ্ঠান ভারতের ই-কমার্স নিয়ে জরিপ, স্টাডি ইত্যাদি প্রকাশ করছে। তারা পূর্বাভাসও দিচ্ছে যা পড়ে যে কারো মনে হতে পারে যে ভারতের লোকজন হয়তো পাগলের মতো অনলাইনে কেনাকাটা করছে। হ্যা, দেশটির লোক কেনাকাটা করছে। কিন্তু সেটা কতটুকু এবং বাস্তব চিত্রটা কি?

6

Image Source: Let Us Publish.com 

ভারতে সবচেয়ে বড় তিনটি প্রতিষ্ঠান ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন ইন্ডিয়া এবং স্ন্যাপডিল ব্যাপক হারে লস দিয়ে তাদের বাজার বাড়িয়েছে। ২০১৬ সালে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত লস এর পরিমাণ ১১,৭৫৪ কোটি রুপি যা ভারতের মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান স্পেইস রিসার্চ অর্গ্যানাইজেশন (আইএসআরও) এর বার্ষিক বাজেটের দ্বিগুণ। ২০১৪ সালে আইএসআরও মঙ্গলগ্রহে তাদের স্যাটেলাইট প্রেরণ করে।এশিয়ার দেশ গুলোর মধ্যে ভারতই প্রথমবারের মতো এটি করে। তো বলা হচ্ছে যে এই ১১,৭৫৪ কোটি রুপি দিয়ে আইএসআরও এরকম আরো ২৪টি স্যাটেলাইট নিক্ষেপ করতে পারত।

অন্যদিকে ২০১৬ সালে তিনটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের পরিমাণ ৬,৮০২ কোটি রুপি।

২০১৬ সালে ভারতের মোট অনলাইন গ্রস সেলস এর পরিমাণ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালে বিক্রয়কৃত পণ্যের পরিমাণ ছিল ১১ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৪ সালে ৩-৪ বিলিয়ন ডলার। অনলাইনে যে পণ্য বিক্রী হয় মার্কেটপ্লেস গুলো সেটার থেকে কমিশন পায় এবং এটাই তাদের আয়ের প্রধান উৎস।

২০১৫ সালে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত লস এর পরিমাণ ছিল ৬,০৩১ কোটি রুপি।

বিগত তিন বছরের আয় এবং লস এর পরিমাণ:

  • ২০১৪ সালে ফ্লিপকার্ট এর লস এর পরিমাণ ছিল ৯১৭ কোটি রুপি অ্যামাজন ইন্ডিয়া ৩২১ কোটি রুপি এবং স্ন্যাপডিল ২৬৪ কোটি রুপি।
  • ২০১৬ সালে ফ্লিপকার্ট এবং মিন্ত্রার আয় আগের বছরের তুলনায় ৯৫% বৃদ্ধি পেয়ে ৩,০২১ কোটি রুপি (এটা মার্কেটপ্লেস থেকে পণ্য বিক্রী বাবদে অর্জিত কমিশন) হয়েছে। এর বিপরীতে ২০১৬ সালে তাদের লস হয়েছে ৫,২২৩ কোটি রুপি। ২০১৫ সালে তাদের আয় ছিল ১৫৪৭ কোটি রুপি এবং লস এর পরিমাণ ছিল ২,৯৭৯ কোটি রুপি।
  • ২০১৬ সালে অ্যামাজন ইন্ডিয়া তাদের মার্কেটপ্লেস থেকে কমিশন বাবদে আয় করেছে ২,২৭৫ কোটি রুপি লস দিয়েছে ৩,৫৭১ কোটি রুপি। ২০১৫ সালে তাদের আয় ছিল ১,০২২ কোটি রুপি এবং লস এর পরিমাণ ছিল ১,৭২৩ কোটি রুপি।
  • ২০১৬ সালে স্ন্যাপডিল আয় করেছে ১,৪৫৭ কোটি রুপি লস দিয়েছে ২,৯৬০ কোটি রুপি। ২০১৫ তে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ৯৩৮ কোটি রুপি লস ছিল ১,৩১৯ কোটি রুপি।

কর্মচারীদের বেতন বাবদে খরচ:

  • ২০১৬ সালে ফ্লিপকার্ট কর্মচারীদের বেতন এবং স্টক অপশন সুবিধা প্রদান বাবদ খরচ করেছে ১,৮৮০ কোটি রুপি।
  • অ্যামাজন ইন্ডিয়া ২০১৬ সালে Employee Benefit বাবদে ২০১৫ এর তুলনায় ৯২% বেশি খরচ করেছে। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি খরচ করে ৩৮৫.৪৯ কোটি রুপি এবং ২০১৫ সালে ২০২ কোটি রুপি।
  • ২০১৬ সালে স্ন্যাপডিল কর্মচারীদের বেতন বাবদ খরচ করে ৯১১ কোটি রুপি এবং ২০১৫ সালে ৩৬৭ কোটি রুপি। ১৪৮% প্রবৃদ্ধি।

ব্যবসায় প্রমোশন এবং বিজ্ঞাপন বাবদে খরচ:

  • ২০১৬ সালে ব্যবসায় প্রমোশন বাবদে ফ্লিপকার্ট খরচ করেছে ১,০৮৬ কোটি রুপি যা ২০১৫ এর খরচের তুলনায় ১১৩% বেশি।
  • ২০১৬ সালে অ্যামাজন ইন্ডিয়ার ব্যবসায় প্রমোশন এবং বিজ্ঞাপন বাবদে খরচ হয়েছে ২,১৬৩ কোটি রুপি। ২০১৫ তে একই খাতে তাদের খরচের পরিমাণ ছিল ১,৪০৫ কোটি রুপি।
  • ২০১৬ সালে ব্যবসায় প্রমোশন এবং বিজ্ঞাপন বাবদে স্ন্যাপডিল খরচ করেছে ১,৪৭৯ কোটি রুপি যা আগের বছরের তুলনায় ৩২% বেশি।
  • অ্যামাজন ইন্ডিয়া এবং স্ন্যাপডিল এর আইনী খরচ (Legal Expense):
  • ২০১৬ সালে অ্যামাজন ইন্ডিয়ার আইনি খরচ হয়েছে ৫২২ কোটি রুপি। ২০১৫ সালে এই খাতে তাদের খরচ হয়েছে ২২১ কোটি রুপি।
  • ২০১৬ সালে স্ন্যাপডিল এর আইনি খরচের পরিমাণ ছিল ২০.৯ কোটি রুপি যা ২০১৫ এর খরচের তুলনায় দ্বিগুণ।

কেন এই লস?

অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর এই বিশাল পরিমাণ লস এর পিছনে মূল কারণ হচ্ছে কিভাবে ক্রেতাকে তাদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা যায় তার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা। ২০১৩ এর আগ পর্যন্ত স্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করছিল কিন্তু ২০১৩ সালে অ্যামাজন আসার পরে চিত্র রাতারাতি পালটে যায়। অ্যামাজন ইন্ডিয়া খুবই অল্প সময়ে প্রচুর বিনিয়োগ করে বিশাল সংখ্যক ক্রেতা তৈরি করে ফেলে। অ্যামাজন এর এই খরচের হিড়িকে অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ভড়কে যায় এবং তারাও হঠাৎ করে খরচ করা শুরু করে এবং এখান থেকেই শুরু হয় সমস্যা। অ্যামাজন এর প্রচুর টাকা আছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যেই ভারতে দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং আরো তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে কিন্তু ফ্লিপকার্ট বা স্ন্যাপডিল সেরকম অবস্থানে নেই। স্ন্যাপডিল ইতিমধ্যেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। এখন আছে শুধু ফ্লিপকার্ট কিন্তু তারও অনেক অস্থিরতা অনেক সমস্যা।

7

Image Source: Coupon Clue

ক্রেতা ধরে রাখার জন্যে ব্যবসাতে লস হওয়া স্বত্বেও এ তিনটি প্রতিষ্ঠান ব্যাপক হারে বিজ্ঞাপনের পিছনে খরচ করছে এবং খরচ কেবল বাড়াচ্ছে। অনেকের মতে তাদের এই স্ট্রাটেজি ভুল। তারা পুরো ভারতের ই-কমার্স বাজার দখল করে নেবার স্বপ্ন নিয়ে এই কাজ করছে কিন্তু এটা অলীক স্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়।

কবে আসবে ই-কমার্সের বছর?

বিগত দুই তিন বছর ধরে নানা মহলের বিশেষজ্ঞরা অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাচ্ছেন এবং ই-কমার্স নিয়ে অনেক রিপোর্ট অনেক জরিপ ইত্যাদি প্রকাশ করছেন এবং তাদের সবাই বলছেন যে সামনের বছর গুলো হবে ই-কমার্সের উত্তরণের বছর কিন্তু সেই বছর এখনো আসে নি। ২০১৬ সালে ই-কমার্স বাজারের আশানুরূপ বৃদ্ধি হয় নি বরং আশার তুলনায় কম হয়েছে। এখন একটা ব্যাপার সবার কাছে পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে যে ভারতের বাজারে শেষ পর্যন্ত দুইটি প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকবে একটি হচ্ছে অ্যামাজন এবং অন্যটি হয়তো ফ্লিপকার্ট নয়তো স্ন্যাপডিল বা অন্য কেউ। অ্যামাজন ইন্ডিয়ার মূল সুবিধা হচ্ছে তাকে বিনিয়োগকারীদের কাছে বারবার দৌড়াতে হচ্ছে না। তাদের জন্যে বিনিয়োগ মূল সমস্যা নয়। কিন্তু ফ্লিপকার্ট বা স্ন্যাপডিলকে প্রতিমূহুর্তে বিনিয়োগের চিন্তা করতে হচ্ছে।

২০১৫ সালে গুগল এবং ফরেস্টারের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে ২০১৬ এর শেষ নাগাদ ভারতে অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু দ্যা অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অব ইন্ডিয়া (অ্যাসোচ্যাম) এবং রিসার্জেন্ট ইন্ডিয়া ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃক যৌথভাবে প্রকাশিত স্টাডিতে বলা হয় যে ২০১৬ সালে ভারতে অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৯০ লক্ষে। অর্থাৎ ক্রেতার সংখ্যা যেভাবে বলা হয়েছিল সেভাবে বাড়েনি।

ভারতের জনগণের আয়ের পার্থক্য আরেকটি বড় ব্যাপার:

ভারতেও নিম্নআয় এবং দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী প্রচুর লোক আছে। এদেরকে অনলাইনে কেনাকাটা করাতে অভ্যস্ত করান সোজা নয় সেটাতে আরো খরচ হবে। ভারতে প্রতি তিন কোটি জনসংখ্যায় আয়ের ব্যবধান দারুণভাবে বেড়ে যায়।  বিশ্বব্যাঙ্কের ২০১৩ সালের তথ্য মতে ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি লোক দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করে।

বর্তমানে তিন কোটি ভারতীয় নিয়মিত ফ্লিপকার্ট থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করে। ধরা যাক যে, এই তিন কোটির প্রত্যেকে গড়ে ১০০ রুপির কেনাকাটা করে ফ্লিপকার্ট মার্কেটপ্লেস থেকে। অর্থাৎ তিন কোটি ক্রেতার কারণে ফ্লিপকার্ট তিনশ কোটি রুপি আয় করছে।এখন ব্যবসা বাড়াতে ফ্লিপকার্টকে আরো ক্রেতা যোগ করতে হবে তাদের প্ল্যাটফর্মে এবং এটাই হবে সমস্যা কারণ পরবর্তী তিন কোটি মানুষের আয় আগের ওই তিন কোটি অনলাইন ক্রেতার থেকে অনেক কম। তাই তারা অনলাইনে কেনাকাটায় গড়ে ১০০ রুপিও খরচ করবে না । তার মানে প্রথম তিন কোটি ক্রেতা থেকে ফ্লিপকার্ট যে তিনশ কোটি রুপি আয় করছে পরবর্তী তিনশ কোটি রুপি আয় করার জন্যে ফ্লিপকার্টকে আরো ১০ কোটি ক্রেতা তৈরি করতে হবে। যদি প্রথম তিন কোটি ক্রেতা তারা তৈরি করতে না পারে তাহলে পরবর্তী ১০ কোটি ক্রেতা ধরতে তাদের আরো কষ্ট হবে আরো অনেক টাকা নষ্ট হবে।সোজা কথা, শহর থেকে গ্রামের দিকে যতই যেতে থাকবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে বাজার বাড়ানো এবং নতুন ক্রেতা পাওয়া আরো দুস্কর হয়ে উঠবে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা করতেও পারবে না।

ছোট শহর বা গ্রামের ক্রেতারা রিপিট কাস্টমার নয়:

ভারতের অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলো এখন বড় শহর ছেড়ে আস্তে আস্তে মাঝারী, ছোট শহর এবং গ্রামে তাদের বাজার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এসব অঞ্চলে ই-কমার্স এখনো সেভাবে জনপ্রিয় হয় ওঠেনি। অ্যামাজন ইন্ডিয়ার ভাষ্যমতে তাদের নতুন ক্রেতার ৭০% ছোট শহর বা গ্রামের অধিবাসী। ফ্লিপকার্টের নতুন ক্রেতাদের মধ্যে এই হার ৪২%। কিন্তু এটাকেও বিশেষজ্ঞরা পাত্তা দিচ্ছেন না। তারা বলছেন যে এই যে ছোট শহর বা গ্রামের মানুষ যারা এসব মার্কেটপ্লেস থেকে কিনছে তারা নিয়মিত কিনছে না। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন ইন্ডিয়া এবং স্ন্যাপডিল আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট অফারের বিজ্ঞাপন দেখে এসব লোক তাদের মার্কেটপ্লেস থেকে পণ্য কিনছে এরা কেউই রিপিট কাস্টমার হচ্ছে না।

ক্যাশ-অন-ডেলিভারি:

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গুলোর জন্যে সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে ক্যাশ-অন-ডেলিভারি। যদি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গুলোকে লাভের মুখ দেখতে হয় তাহলে সিওডি বন্ধ করা খুবই জরুরি। বর্তমানে ভারতের ই-কমার্স সাইটগুলোতে সঙ্ঘটিত লেনদেনের ৮০% সিওডি। যেখানে বড় শহরের অধিবাসীদের অনেকে কার্ড-হোল্ডার হওয়া স্বত্বেও তারা কার্ডে লেনদেন করে না। তারা সিওডিতে লেনদেন করতে চায় কারণ তারা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরে আস্থা রাখতে পারে না। বড় শহরেই যখন এই অবস্থা তখন ছোট শহর এবং গ্রামের মানুষদের কার্ডে কিনতে অভ্যস্ত করানো আরো দুরূহ এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। কিন্তু সিওডি খুবই ব্যয়বহুল একটি পন্থা।

প্রডাক্ট রিটার্ণ:

ভারতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে প্রডাক্ট রিটার্ণ। সিওডি তে অনেক সময়ে ক্রেতা পণ্য দেখে পছন্দ না হলে টাকা দেয় না। এই পণ্যটি পাঠাতে বিশাল খরচ হয়। আবার পণ্যটি নিয়ে আসতেও খরচ হয়। অনেক সময় ক্রেতা পণ্যের প্যাকেজিং নষ্ট করে ফেলে তখন পণ্যটিকে পুনরায় মোড়কীকরণ করতে হয় এবং বিক্রীর জন্যে প্রস্তুত করতে হয়। এটিরও খরচ আছে।

ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন, এরকম অনেক ক্রেতার ক্ষেত্রে কয়েকবার তাদের পণ্য ফেরত নিয়ে নতুন পণ্য দিয়েছে। প্রডাক্ট রিটার্ণের হার কমাতে দুটো প্রতিষ্ঠানই তাদের রিটার্ণ এবং রিফাণ্ড পলিসিতে পরিবর্তন এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে কোন অবস্থাতেই একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রডাক্ট রিটার্ণের হার ১০% বেশি হওয়া উচিত নয়। তাহলে লস এর পরিমাণ আরো বেশি হবে।

তাহলে গুড় খাচ্ছে কারা?

ভারতের ই-কমার্সের বিশাল বাজার ধরবার জন্যে ই-কমার্স সেক্টরের কারণে এখন সবচেয়ে ভাল আছে লজিসটিক্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, গুগল এবং ফেইসবুক এর মতো ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান। মাঝখান দিয়ে এরাই অনেক টাকা কামিয়ে নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু সাদৃশ্য:

বাংলাদেশে ই-কমার্স বর্তমানে একটি উদীয়মান সেক্টর। এখনো রাজধানী ঢাকাতেই ই-কমার্স সীমাবদ্ধ। অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে মানুষ অনলাইনে কিনছে কিন্তু সেটা উল্লেখযোগ্য হারে নয়। বাংলাদেশে অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা এখনো খুবই কম।

ভারত এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বেশ কিছু মিল আছে।

  • প্রথম, ভারতের জনসংখ্যার বড় অংশ এখনো গ্রামে বাস করে এবং কৃষি বা এর সাথে সম্পর্কিত কোন কাজ বা পেশা তাদের জীবিকা অর্জনের প্রধান মাধ্যম, বাংলাদেশেও তাই।
  • দ্বিতীয়, বাংলাদেশের গ্রামের লোকের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে কিন্তু সেটা ই-কমার্সের জন্যে উপযোগী নয়। এখনো গ্রামে নিরবিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। গ্রামে কমপিউটার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক কম। এখনো গ্রামে উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ নেই। স্মার্টফোন হয়তো অনেকের আছে কিন্তু তারা সেটাতে অনলাইনে কেনাকাটা করেন না। ভারতেও একই অবস্থা বিরাজমান।
  • তৃতীয়, ভারতের মতোই বাংলাদেশে মানুষের আয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিরাজমান।
  • চতুর্থ, ভারতের মতো বাংলাদেশের ই-কমার্স সেক্টরেও ডেলিভারি একটি বিশাল সমস্যা।
  • পঞ্চম, ভারতের মতো বাংলাদেশেও অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্যাশ-অন-ডেলিভারি সবচেয়ে জনপ্রিয়। কারণ অনলাইনে কেনাকাটায় লোকে এখনো আস্থা লাভ করতে পারে নি।
  • ষষ্ঠ, ভারতের মতো বাংলাদেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে প্রডাক্ট রিটার্ণ একটি বড় সমস্যা।

বাংলাদেশের অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর জন্যেও একই চ্যালেঞ্জ:

উপরের সাদৃশ্যগুলো বিবেচনা করলে বাংলাদেশী অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোও ভারতীয় অনলাইন মার্কেটপ্লেসের মতো একই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে-

বিনিয়োগ: বাংলাদেশেও বর্তমানে যেসব প্রথমসারির অনলাইন মার্কেটপ্লেস আছে তারাও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো এখনো টাকা খরচ করে যাচ্ছে এবং লাভের মুখ দেখেনি যেমন- দারাজ, কেইমু, আজকের ডিল, বিক্রয় ডট কম । এসব প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা খরচ করছে এবং এদের খরচের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেলিভারি, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট এর পিছনে খরচ হচ্ছে। এসব অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলো যদি বাংলাদেশে তাদের বাজার বাড়াতে চায় তাদের বিশাল বিনিয়োগ নিয়ে নামতে হবে।

লস দিয়ে বাজার তৈরি: ফ্লিপকার্ট ২০০৭ সালে ভারতে তাদের ব্যবসা শুরু করে। প্রাথমিক অবস্থায় বড় বড় শহরে তারা ব্যবসা শুরু করে এবং তাদের বাজার খুবই দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বাজার তৈরির জন্যে তারা লস দিয়ে ব্যবসা করে গিয়েছে। বাংলাদেশেও অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোকে প্রাথমিক অবস্থায় এভাবে লস দিয়ে বাজার বৃদ্ধি করে যেতে হবে। আস্তে আস্তে প্রতিযোগিতা যত তীব্র হবে লসের পরিমাণও বাড়তে থাকবে।

নতুন কাস্টমার তৈরি এবং রিপিট কাস্টমার তৈরি: ফ্লিপকার্ট লস দিয়ে ক্রেতা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে কিন্তু তাদের সবাই রিপিট কাস্টমার না। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে বাজার বৃদ্ধি আরো জরুরি কিন্তু তার থেকেও জরুরি লয়াল কাস্টমার বা রিপিট কাস্টমার তৈরি করা। কারণ রিপিট কাস্টমার তৈরি করতে না পারলে বাজারে টিকে থাকা সমভব নয়। ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিল, এবং অ্যামাজন ইন্ডিয়া তিনটিই মার্কেটপ্লেস এবং তিনটিই প্রচুর পণ্য নিয়ে কাজ করছে। আর এ জন্যেই রিপিট কাস্টমার তৈরি করা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে তাদের জন্যে। অ্যামাজনের জন্যে টাকা কোন সমস্যা না কিন্তু ফ্লিপকার্ট বা স্ন্যাপডিলের সেই সুবিধা নেই। স্ন্যাপডিল ইতিমধ্যেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। এখন কে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সেটাই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোও এই সমস্যা ফেইস করবে।

আয় বৃদ্ধি এবং বাজার বৃদ্ধি : ভারতে প্রথমে বড় শহরগুলোতে ই-কমার্স জনপ্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট। অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলো এই তিনটি শহরকেই মোটামুটি টার্গেট করবে। এসব শহরে উচ্চ আয়ের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে অন্যান্য জায়গার চেয়ে বেশি। এদের একটা বড় অংশ শিক্ষিত এবং অনেকেই স্মার্টফোন কম্পিউটার ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এখানে ই-কমার্স খুব দ্রুত বাড়বে এবং যে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে ভাল সেবা এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহ করবে তাদের ব্যবসা তত দ্রুত বাড়বে।

মূল চ্যালেঞ্জটা হবে যখন অন্যান্য বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও গ্রামে ই-কমার্স বিস্তারের সময়। ভারতের মতো বাংলাদেশেও লোকের আয়ের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিরাজমান। এখানে ২০১০ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এর ২০১০ বাংলাদেশ খানা আয়-ব্যয় জরিপ এর থেকে আয় সম্পর্কিত একটি পরিসংখ্যান তুলে দিলাম। পরিসংখ্যান ব্যুরো মোট ১২,২৪০ জনের উপরে জরিপটি পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে শহরবাসী ৪,৪০০ জন এবং গ্রামবাসী ৭,৮৪০ জন।

 

16326185_1833565800254078_725115218_o

পাঠক, এখান থেকেই বাংলাদেশের মানুষের আয়ের পার্থক্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবেন ।

ধরা যাক,  ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট মিলিয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ লোক বাংলাদেশে অনলাইন মার্কেটপ্লেস থেকে কেনাকাটা করে এবং তারা গড়ে ১০০ টাকা করে কেনাকাটা করে।  তাহলে তারা মোট ৪০ কোটি টাকার পণ্য ক্রয় করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলো ৪০ কোটি টাকা আয় করে। এখন মার্কেটপ্লেসগুলো ঠিক করল যে তারা তাদের বাজার বাড়াবে এবং আরো ক্রেতা তৈরি করবে এবং আরো ৪০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রী করবে। এখানেই শুরু হবে বিশাল সমস্যা। কারণ নতুন যে চল্লিশ লক্ষ ক্রেতা যোগ হবে তারা কিন্তু প্রথম চল্লিশ লক্ষের মতো টাকা আয় করে না। তাই তারা সেভাবে অনলাইনে পণ্য কেনাকাটা করতে চায় না বা কম করে। তাহলে এর মানে কি দাড়াল? ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরবর্তী চল্লিশকোটি টাকা আয় নিশ্চিত করার জন্যে আসলে ৮০লক্ষ লোকের কাছে পৌছাতে হবে। এখন এই ৮০ লক্ষ লোকের বড় অংশই বড় শহরের অধিবাসী নন। তারা বিভাগীয়, জেলা শহর বা গ্রামের অধিবাসী। এখন এদেরকে কিভাবে অনলাইনে আনা যায় এবং আনা গেলেও এদের মতো লোকদের কিভাবে রিপিট কাস্টমার বানানো যায় এটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। আগেই উল্লেখ করেছি যে ভারতে ছোট শহর ও গ্রামের লোকেরা অনলাইনে কেনাকাটা করে তখনি যখন তারা ডিসকাউন্ট পায়। অনলাইন মার্কেটপ্লেস গুলো উচু ডিসকাউন্ট দিয়ে এসব ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে কিন্তু এটা স্বল্পস্থায়ী একটা ব্যাপার।

উদীয়মান বাজারের চ্যালেঞ্জ: এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান বাজারে যেসব চ্যালেঞ্জ থাকে সেগুলো তো রয়েছেই। উন্নত অবকাঠামোর অভাব, ই-কমার্স সম্পর্কিত পলিসির সমস্যা ইত্যাদি।

শেষের কথা:

এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে আচ্ছা এত সমস্যা আছে তা না হয় বুঝলাম কিন্তু এর থেকে উত্তরণের উপায় কি? এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় আমারও জানা নেই।আমার এই পোস্ট লেখার উদ্দেশ্য সমস্যার কি সমাধান আছে তা জানানোর জন্যে নয় বরং যারা অনলাইন মার্কেটপ্লেস নিয়ে যারা কাজ করবেন বা করছেন বা যেসব মার্কেটপ্লেস আছে তাদেরকে সচেতন করে তোলা।

8

সত্যি কথা বলতে আমাদের দেশের ই-কমার্স এর অবস্থা এখন সেই চা এর মতো। আজ চা আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম চা বাগান স্থাপিত হয়। ব্রিটিশ চা উৎপাদকরা এদেশে চা কে জনপ্রিয় করে তোলার জন্যে প্রথম প্রথম লস দিয়ে ফ্রিতে চা বিক্রী করা শুরু করল। তখন অনেকে চা পান করলেও সেটা সেরকমভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। দুধ ছিল বাংলাদেশের মানুষদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়। তখন ব্রিটিশরা দুধ এর সাথে চা মিলিয়ে চা তৈরি করে বিক্রী শুরু করল এবং সেটাই আমাদের দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। ঠিক একই ভাবে বাংলাদেশের মানুষ অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত নয়। তাদেরকে অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত করতে একটা লম্বা সময় লাগবে।

লেখক: এস এম মেহদী হাসান

সূত্র:

দ্যা ইকনোমিক টাইমস (১)

দ্যা ইকনোমিক টাইমস (২)

সামহোয়্যার ইন ব্লগ

বিজনেস টুডে

উইকিপিডিয়া

বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

Comments

comments

2 Comments

  1. Rashed Moslem

    Major issue in Bangladesh is pretty simple… due to huge buzz many of the new businessmen are coming in ecommerce just to make quick money. And we are provoking them more by saying ecommerce does not need investments. So unnecessary and uneducated people are coming in this sector and making things complicated. We need to stop this first. We need big names for the sector who can spend a lot and build the infrastructure. Big names like: AIC, Square, Beximco etc needs to step on in ecommerce. With only 12-14 lakh user base ecommerce is going nowhere. So all the associations and bodies must change their strategy and make the industry open to ensure big name entrance. Those who are using social media to sale they won’t survive but that is the ugly truth.

  2. Rashed Moslem

    And one more thing. We don’t need quantity rather we need quality. So many e commerce business will do nothing for the industry. We need few big and huge names with proper and sustainable investment.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *