ভারতীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: পণ্য ডেলিভারি

745

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের ই-কমার্স সেক্টর এখন খুবই দ্রুত হারে বাড়ছে। প্রায়ই প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে খবর প্রকাশিত হচ্ছে যে, ভারতের ই-কমার্স বাজার শুধু বেড়েই চলেছে। গোল্ডম্যান স্যাক্স এর তথ্য মোতাবেক ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপির মোট ২.৫% আসবে ই-কমার্স থেকে। বর্তমানে দেশটির ই-কমার্স বাজারের আকার ২০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ৩০০ বিলিয়নে পৌছবে।

এ বছরের মে মাসে দ্যা ইকনোমিক টাইমসে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয় যে ভারতের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ৫০০ কর্মী নিয়োগ দেবে যাদের প্রত্যেককে এক কোটি রুপি বেতন প্রদান করা হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট সুইস গ্রুপ (Credit Suisse Group AG) এর মতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের ই-কমার্স বাজারে চীনের মতো ব্যাপক প্রসার হবে। গত বছরে চীনের ই-কমার্স বাজার ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ২০০৭ সালে চীনের ই-কমার্স বাজারের আকার ছিল ৭ বিলিয়ন ডলার সেখান থেকে এটি বৃ্দ্ধি পেয়ে গত বছরে ৪৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌছায়। ক্রেডিট সুইসের মতে ভারতের ই-কমার্স বাজারের মূল্য বর্তমানে ৪ বিলিয়ন ডলার।

এসব খবর গুলো পড়ে যে কোন সাধারণ লোকের মনে এ ধারণাই হবে যে ই-কমার্স ভারতে খুবই দ্রুত বাড়ছে এবং ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো ব্যবসা করে লালে লাল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতে ই-কমার্স এখন জনপ্রিয় সত্যি এবং এ খাতে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আসছে এটাও সত্যি কিন্তু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সেভাবে লাভের মুখ দেখতে পারে নি এবং তাদের জন্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পণ্য ডেলিভারি। হ্যা পাঠক, আপনি ঠিকই শুনছেন “পণ্য ডেলিভারি” । ভারতের রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সেরকম উন্নত নয় এবং এ কারণে ক্রেতার কাছে পণ্য ডেলিভারি দিতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে রিতীমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নয়াদিল্লী-ভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং ফার্ম টেকনোপাক (Technopak)  এর তথ্যমতে ভারতের ই-কমার্স স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট পণ্য বিক্রী ৩০% লজিস্টিক্স খাতে ব্যয় করে থাকে। গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজন ডট কম তাদের আয়ের ১১.৭% লজিস্টিক্স খাতে খরচ করে । চীনে আলিবাবা গ্রুপ হোল্ডিং লিমিটেড পণ্য ডেলিভারির খরচ ক্রেতা এবং মার্চেন্টের মধ্যে ভাগ করে নেয় তারা ডেলিভারির ব্যয়ভার বহন করে না।

মিসেস রাজমান সিং তামিলনাড়ুর মাদুরাইতে বসবাস করেন। এটি একটি ছোট শহর। তিনি শপক্লুজ নামক একটি ওয়েবসাইট থেকে পণ্য কিনে থাকেন। প্রতি রবিবারে তিনি শপক্লুজ  ওয়েবসাইটটি ব্রাউজ করে থাকেন ভাল কোন ডিসকাউটন্ট পাবেন এ আশায়। তিনি দু’শ রূপী দিয়ে একটি শাড়ি ওয়েবসাইট থেকে কিনে ফেললেন।

ওয়েবসাইটে তিনি কয়েকটি ক্লিক করে শাড়িটি কিনে ফেললেন কিন্তু ব্যাক-এণ্ডে তার কাছে এ শাড়ি পৌছে দিতে শুরু হলো এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। শাড়িটি এখন আছে ভারতের গুজরাট প্রদেশের পশ্চিমে সুরাটে সেখান থেকে তিনদিনের মধ্যে ১২০০ মাইল (১৯০০ কিলোমিটার) দুরত্ব অতিক্রম করে রাজমান সিং এর বাড়ীতে শাড়িটি পৌছে দেয়া হবে। ৩০ জনের বেশি লোক এ শাড়িটি বহন করবে। টানা দুদিন ধরে ট্রাকে তারপরে প্লেনে এবং শেষে মোটর বাইকে করে ডেলিভারি পার্সন তার বাড়ীতে শাড়িটি ডেলিভারি করবেন। এখানে শাড়িটির যাত্রার একটি ছবি দেয়া হলো।

1

১) ফ্যাবডিল প্রথমে অর্ডারটি সুরাট থেকে ডেলিভারি দিল 

2

২) এরপরে সেটি আসল মুম্বাই এয়ারপোর্টে সেখান থেকে প্লেনে চেন্নাই ডেলিভারি দেয়া হবে। 

3

৩) এরপরে  চেন্নাই থেকে মাদুরাইতে যাবে ।  

শাড়িটি ডেলিভারি দিতে শপক্লুজ এর মোট খরচ হবে ৪৫ রুপি অর্থাৎ শাড়িটির দামের চার ভাগের এক ভাগ ডেলিভারিতে খরচ হয়ে যাচ্ছে। শাড়িটি থেকে শপক্লুজ আয় করবে মাত্র ৩৩.৪০ রূপি এবং এ আয় থেকে প্রতিষ্ঠানটি ডেইলি অপারেটিং কস্ট, কর্মচারীদের বেতন, সহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে লাভ থাকছে না। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা টাকা ঢেলে যাবার ফলে শপক্লুজ টিকে যাচ্ছে। বাকী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোরও একই অবস্থা।

4

ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজন ইন্ডিয়া, স্ন্যাপডিল সহ ছোট-বড়-মাঝারী সব ধরণের প্রতিষ্ঠান বিদেশী বিনিয়োগ পাচ্ছে এবং সবাই এর উপরে টিকে আছে। সবাই ভারতের আলিবাবা ডট কম হিসেবে নিজেকে দেখতে চায়। তাদের ওয়েবসাইটে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্যে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতি সহ্য করেও বিভিন্ন ধরণের আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট অফার সহ নানা ধরণের অফার দিচ্ছে। প্রতিটা কোম্পানীর লক্ষ্য হচ্ছে নানাভাবে ক্রেতাদের অনলাইনে আকৃষ্ট করে তাদেরকে অনলাইনে কেনাকাটায় অভ্যস্ত করান। লাভ করাটা এখন তাদের মূল লক্ষ্য নয়। কিন্তু এভাবে তো আর চিরকাল চলতে পারে না।

ভারতের ই-কমার্স সেক্টরে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে তবে সেটাও আস্তে আস্তে কমে আসছে। অনেক বিনিয়োগকারী এসব প্রতিষ্ঠানকে লাভের জন্যে চাপ দেয়া শুরু করেছে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তারা চাইলেই কালকে থেকে লাভ দিতে পারবে না। বিশ্ববিখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ডট কমেরই লাভের মুখ দেখতে ২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

শপক্লুজ এর প্রধান নির্বাহী সঞ্জয় শেঠী বলছেন যে আগামী বছরে তার প্রতিষ্ঠান লাভের উপরে জোর দেবে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ১০০ রুপি বিক্রীতে ১০ রুপি লাভ করে থাকে। ফ্লিপকার্ট ২০১৭ সালে লাভের মুখ দেখবে এবং স্ন্যাপডিল আগামী ২/৩ বছর সময় নেবে।

দ্যা ওয়াল স্ট্রীট জার্ণালে প্রকাশিত এ লেখাটি পড়েই আমার বাংলাদেশের ই-কমার্স সেক্টরের কথা বিশেষ করে ই-ক্যাব এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা মনে হয়েছে। আমাদের দেশেও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পণ্য ডেলিভারি। ভাল ডেলিভারি ব্যবস্থা না থাকার কারণে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারছে না।

একই সাথে  “লাভ” আরেকটি বড় প্রশ্ন। দেশীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক অবস্থায় পৌছতে সময় লাগবে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১% ও এখনো অনলাইনে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত নয়। লাভ করতে হলে আগে সাধারণ মানুষের কাছে ই-কমার্সকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে এবং অনলাইনে কেনাকাটাকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।

এ কারণে যারা ই-কমার্স ব্যবসা করছেন তাদেরকে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবসা-পরিচালনা এবং দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকবার মানসিকতা নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে  যেতে হবে। আর যেসব তরুণ-তরুণীরা ই-কমার্স উদ্যোক্তা হতে চান তাদেরকে অবশ্যই খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। হুজুগে পড়ে ই-কমার্স ওয়েবসাইট চালু করলে তাতে লাভ তো হবেই না বরং ক্ষতি হবার সম্ভাবনাই বেশি।

সূত্র:

দ্যা ওয়ালস্ট্রীট জার্ণাল (১)

দ্যা ওয়ালস্ট্রীট জার্ণাল (২)

Comments

comments

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *