বিলিয়ন ডলার কম্পানি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে গ্রোথস্টোরি

762

কৃষ্ণন গণেশ এবং মিনা গণেশ কে ভারতের প্রথম উদ্যোক্তা যুগল বললে খুব ভুল হবে না। তারা দুজনে মিলে ২০১১ সালে গ্রোথস্টোরি.ইন নামে একটি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান চালু করেন। বর্তমানে এটি ভারতের সবচেয়ে বড় স্টার্ট-আপ প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি। গ্রোথস্টোরির মূলমন্ত্র হচ্ছে “তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীরা যা করছে তাই কর কিন্তু খুবই নিখুত ভাবে তা কর।

গ্রোথস্টোরি মূলত অ্যাপ-ভিত্তিক স্টার্ট-আপ নিয়ে কাজ করে। গ্রোথস্টোরির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শিক্ষা, গৃহ-উন্নয়ন, খাবার, কেটারিং, ক্লাউড-ভিত্তিক সফটওয়্যার খাতে কাজ করছে। এসব খাতে ভারতে ইতিমধ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠান চলে এসেছে। সেদিক দিয়ে বলতে গেলে প্রতিটি খাতই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক খাত যেখানে ভুল করার অবকাশ নেই।

গ্রোথস্টোরির লক্ষ্যই হচ্ছে তাদের প্রতিটি ব্যবসাকে বড় করে তোলা এবং শুধু জাতীয় নয় আন্তর্জাতিক বাজারেও যেন সেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সকলের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে পারে। ফোর্বস ইণ্ডিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কৃষ্ণণ বলেন “আমরা আমাদের ব্যবসাকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে চাই যেখানে প্রতিষ্ঠানটি সবসময় প্রথম সারিতে থাকবে। বর্তমানে আপনি যদি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা দাঁড় করাতে চান তাহলে আপনাকে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে যেটি সবসময়ে প্রথমে থাকবে এবং সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা পাবে। গ্রোথস্টোরির প্রতিটি ভেঞ্চারকে আমরা আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে বিলিয়ন ডলার কম্পানিতে পরিণত করতে চাই এবং তা করতে হলে প্রয়োজন দ্রুত বেড়ে ওঠা, মূলধনের সরবরাহ, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং কর্পোরেট গভর্ণেন্স। ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ব্যবসাকেই তার খাতে এক ধরণের অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে হবে এবং এটাই আমাদের মূল শক্তি।”

Krishnan and Meena Ganesh

Source: Forbes India

এ পর্যন্ত তারা বেশ কয়েকটি সফল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে খুবই ভাল দামে বিক্রী করেছেন। যার মধ্যে আছে ভারতের সবচেয়ে বড় অনলাইন টিউটরিং প্রতিষ্ঠান টিউটরভিস্তা।

দ্যা হিন্দু পত্রিকায় মিনা গনেশ এর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। ই-ক্যাব ব্লগের পাঠকদের জন্যে সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো-

গ্রোথস্টোরি.ইন এর কিভাবে শুরু করলেন?

আমরা দু্জনেই সিরিয়াল এন্ট্রিপ্রিন্যুর। আমরা একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছি এবং এক পর্যায়ে টিউটরভিস্তা  প্রতিষ্ঠা করেছি। পিয়ারসনগ্রুপের কাছে টিউটরভিস্তা বিক্রী করে দেবার পরে আমরা গ্রোথস্টোরি.ইন প্রতিষ্ঠা করি। আমরা গ্রিনফিল্ড ভেঞ্চার এবং প্যারালাল এন্ট্রিপ্রিন্যুরশিপ প্রমোট করার লক্ষ্য নিয়ে এ প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছি। ভারতের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে অনেক সমস্যা আছে যেগুলো এখনো সমাধান করা হয়নি। আপনি যদি যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর দিকে তাকান তাহলে দেখবেন যে তারা বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে এবং এ কারণে এসব দেশের বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে। যেমন-সান ফ্রান্সিসকো এবং নিউইয়র্কে এমন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন আছে যার মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী প্রাইভেট টয়লেট কোথায় কোথায় আছে তা জানতে পারবে কারণ পাবলিক টয়লেটগুলো ব্যবহারপোযগী নয়। এটা শেয়ার্ড ইকনোমির ভাল উদাহারণ। ভারতে এরকম অনেক সমস্যা রয়েছে এবং এগুলো সমাধান করলে বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি করা সম্ভব।

গ্রোথস্টোরির মাধ্যমে আমরা বিগবাস্কেট ডট কম চালু করেছি। এটি একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য (ইংরেজিতে যাকে বলে Grocery) অনলাইনে বিক্রী করা হয়। এরপরে আমরা ব্লু-স্টোন ডট কম নামে একটি অনলাইন জুয়েলারি স্টোর চালু করেছি, পোর্শিয়া ডট কম  স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরণের সেবা প্রদান করে থাকে।

আপনি একজন সিরিয়াল এন্ট্রিপ্রিন্যুর। একটি স্টার্ট-আপ চালু করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের একটু বলুন।

আমরা প্রথমে দেখি যে আগামী ৫-১০বছরের মধ্যে কোন কোন খাতে ভেঞ্চার করা যায়। তারপরে আমরা দেখি যে উক্ত খাতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান আছে কিনা। তারপরে আমরা দেখি উক্ত পণ্য বা সেবার বাজারটা কত বড়। আমরা “Niche Market” এড়িয়ে চলি। যেমন- পোষা প্রাণীদের জন্যে একটি জুয়েলারি স্টোর চালু করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কতজন লোক আছে যারা তাদের পোষা প্রাণীর জন্যে অলঙ্কার কিনবে? এটা হাই-এন্ড মার্কেট এবং একই সাথে নিসে মার্কেট অর্থাৎ এ ধরণের পণ্যের বাজার খুবই সিমীত।

বর্তমানে আমাদের এরকম পাঁচটি প্রজেক্ট চলমান আছে যেখানে মোট ২০ জন লোক কাজ করছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটা প্রজেক্ট বিবেচনা করা হবে। আমরা নিজেরা প্রজেক্টের আইডিয়া নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করব। আমরা সম্ভাব্য বাজার এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের উপরে তথ্য যোগাড় করব এবং তারপরে একটি কোর টীম গঠন করব। এরপরে স্টার্ট-আপটি হয় আমরা পুরোপুরি চালু করব নয়তো করব না। যদি চালু হয় আমরা তখন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল যোগাড় করব।

সিরিয়াল স্টার্ট-আপের চ্যালেঞ্জ গুলো কি কি?

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যে সব স্টার্ট-আপ যে বিলিয়ন ডলার ভ্যালুয়েশন হবে এবং লাভজনক হবে এটা জোর দিয়ে বলা যায় না। খাতায় কলমে পরিকল্পনা এক জিনিস এবং বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা এক জিনিস। এখানে অনেক সূক্ষ ব্যাপার রয়েছে। এ বিবেচনায় এ ধরণের স্টার্ট-আপ চালু করা খুবই কঠিন এবং একজন উদ্যোক্তার উপরে প্রচুর মানসিক চাপ আসবে। ২০জন লোক নিয়ে আপনার পক্ষে বিলিয়ন ডলার ভ্যালুয়েশনের কম্পানি তৈরি করা সম্ভব নয়।

এ জন্যে আমরা প্যারালাল এন্ট্রিপ্রিন্যুরশিপ করছি যেটা আগে করা হয়নি। আমরা বিভিন্ন সেক্টরে বিভিন্ন ধরণের ব্যবসার মডেল নিয়ে কাজ করছি। স্টার্ট-আপ আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত চালু করব না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা একজন নির্ভরযোগ্য পার্টনার পাচ্ছি। আমরা এমন লোককে পার্টনার হিসেবে চাই যিনি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।

ভারতে স্টার্ট-আপ প্রমোটাররা তাদের কম্পানি যথেষ্ট বড় হবার আগেই বিক্রী করার চিন্তা করতে থাকেন। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

আমি মনে করি যে ভারতে উদ্যোক্তারা তার প্রতিষ্ঠানের সাথে খুব গভীরভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন যার কারণে তারা প্রতিষ্ঠান বিক্রী করতে চান না। আসল কথা হচ্ছে আসলে কম্পানি প্রতিষ্ঠা করার পরে কখন এবং কিভাবে তা বিক্রী করতে হবে। যদি সময়মতো তারা কম্পানি বিক্রী না করে থাকে তারা ভুল করবে।

একজন প্রতিষ্ঠাতার জন্যে তার কম্পানি থেকে বের হয়ে আসার উপযুক্ত সময় কখন?

আমরা যদি টিউটরভিস্তার কথা বলি। আমাদের জন্যে এটা ২৩০ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন ছিল। এটার কোন সঠিক উত্তর নেই। কিছু লোক আছে যারা গাছের যত্ন নেয় বড় করে এবং বাগান তৈরি করে। আবার কিছু লোক আছে যারা নার্সারি করে অর্থাৎ চারা গাছ বিক্রী করে। আমরা নার্সারী মডেলে কাজ করি। একটা পণ্যের মতো ব্যবসারও একটা জীবন-চক্র (Life-cycle) আছে। শুরু থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠা পর্যন্ত একটা ব্যবসা বিভিন্ন স্তর পার হয় এবং একেকটা সময়ে একেক ধরণের পরিস্থিতি থাকে এবং সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠাতা এবং ম্যানেজমেন্টকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

আপনি একটা ব্যবসাকে একটি জায়গায় নিয়ে আসার পরে হয়তো সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনি এখন ব্যবসাটি বিক্রী করে দেবেন। আমার কাছে ব্যবসাকে অনেকটা ফলের মতো মনে হয়। একটা ফল কাঁচা থাকে তারপরে পেকে যায় এবং এরপরে ফলটি আরও ভালও হয় না। ওর যতটুকু পাকার দরকার ছিল পেকে গিয়েছে। অনেক সময় আমরাও ভেবেছি যে আমরা কি খুব তাড়াতাড়ি একটি প্রতিষ্ঠান বিক্রী করে দিচ্ছি। আমাদের ডাটা অ্যানালাইটিক্স কম্পানি মার্কেটিক্স টেকনোলজিস ইণ্ডিয়া প্রাইভেট লি: এর কথাই ধরা যাক। আমরা যখন এ ব্যবসা বিক্রী করার সিদ্ধান্ত নেই তখন এটি লাভবান একটি ব্যবসা। আমরা বিনিয়োগ করেছিলাম পঞ্চাশ হাজার ডলার এবং বিক্রী করি ৬৩.৫ মিলিয়ন ডলারে। ২০০৮ সালে যখন আমরা এ প্রতিষ্ঠানটি বিক্রী করি তখন বিগ ডাটা ব্যবসা এত বড় ছিল না। বর্তমানে বিগ ডাটা কম্পানির দাম দশগুণ বেশি। কিন্তু তখন এটা জানার কোন উপায় ছিল না। যদি আমরা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রী না করে দিয়ে নিজেরা এখনো চালাতাম তাহলে এটি হয়তো ততটা লাভবান থাকত না।

আপনার মতে একজন উদ্যোক্তা কোন কোন সেক্টর গুলোতে কাজ করা উচিত?

আমার মতে যেসব সেক্টরে নিশ্চিত ভাবে বিনিয়োগ করা যায় সেগুলো হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদার সেক্টর অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা। এসব খাতে সবসময়ে চাহিদা বজায় থাকবে। দ্বিতীয়ত, প্রথমত চিন্তা করতে হবে যে পণ্য বা সেবাটি নিয়ে উদ্যোক্তা কাজ করবে সেটা মোবাইল ডিভাইস এবং মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেয়া সম্ভব কিনা। তার জন্যে বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপ করা যায় কিনা?

টিকা:

১.সিরিয়াল এন্ট্রিপ্রিন্যুর: কোন উদ্যোক্তা সবসময়ে নতুন ব্যবসা-বুদ্ধি এবং আইডিয়া নিয়ে কাজ করছেন। প্রথাগত উদ্যোক্তার মতো তিনি একটি মাত্র ব্যবসা নিয়ে চিন্তা করেন না। তিনি একটি ব্যবসা শুরু করার পরে একজন পার্টনারের কাছে উক্ত ব্যবসার দায়িত্ব দিয়ে নতুন ব্যবসার আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করে দেন।

২.প্যারালাল এন্ট্রিপ্রিন্যুরশিপ: প্যারালাল এন্ট্রিপ্রিন্যুরও সিরিয়াল এন্ট্রিপ্রিন্যুরের মতো একের অধিক ব্যবসা নিয়ে কাজ করে থাকেন।

৩.গ্রিনফিল্ড ভেঞ্চার: কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্য দেশে ব্যবসা বিস্তারের লক্ষ্যে উক্ত দেশে একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠাতা ঐ দেশে অফিস , কারখানা সবকিছু স্থাপন করে এবং কর্মী নিয়োগ করে। এ ধরণের সুবিধা হচ্ছে উক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তার ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে হয় না।

সূত্র:

দ্যা হিন্দু বিজনেস লাইন

ফোর্বস ইণ্ডিয়া

 

Comments

comments

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *