বাংলাদেশের পেক্ষাপটে সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক তৈরীর সম্ভাবনা

710

বাংলাদেশের পেক্ষাপটে সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক তৈরীর সম্ভাবনা

জাহাঙ্গীর আলম শোভনCollabratech_Supply_Chain_Management_Main

ই কমার্সের কথা আসলেই যে কয়টি সমস্যা আমাদের মনে আসে তার মধ্যে একটি হলো পন্য সংগ্রহ ও ডেলিভারী বিষয়ে। অর্থাৎ একটি পন্য বাজার থেকে এনে কাস্টমারের কাছে পৌছে দেয়া পর্যন্ত যে প্রসিডিওর রয়েছে আমাদের দেশে তা সক্ষমতার প্রশ্নে সন্তোসজনক নয়। সেজন্য এ বিষয়ে উন্নয়ন দরকার। প্রথমে দেখি সমস্যাগুলো কি কি?

০১. সড়ক যোগাযোগ : দেশের সড়ক যোগাযোগ ভালো নয় প্রতন্ত্য অঞ্চলে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর কথা ভাবা যায়না।
০২. ডেলিভারি সার্ভিস : দেশে যেসব কুরিয়ার, পার্সেল, ট্রান্সপোর্ট, পরিবহন, ডেলিভারি সার্ভিস আছে সেগুলো জেলাশহরের বাইরে হোম ডেলিভারি করেনা। ফলে কাস্টমারের ঘোর দোড়ায় পন্য পাঠানো যাচ্ছে না।
০৩. পেশাদারিত্বের অভাব : বেশ কয়েকটি ডেলিভারি সার্ভিস থাকলেও পেশাদারিত্বের চরম অভাব রয়েছে। ফলে তারা সময়মতো পন্য পাঠাতে পারেনা, আবার অনেক ক্ষেত্রে ডেলিভারী মিস হয়, পন্য হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যায়, কখেনো না ভেতর থেকে জিনিসপত্র গায়েব হয়ে যায়।
০৪. সক্ষমতার অভাব: দেশের ই কমার্স এখনো এমন পর্যায়ে যায়নি যে, কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেরা একটি নিজস্ব চেইন প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনা করবে।
০৫. সরকারী সার্ভিস : দেশে সরকারী সার্ভিস, ডাক বিভাগ, রেলওয়ে তো সার্ভিস মারাত্বক খারাপ, পন্য ঠিকমতো পৌছেনা। এবং সমস্যা হলে এর কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়না।

কিন্তু বিষয়টা এখানেই শেষ নয়। আমাদের অনেকগুলো সুবিধা রয়েছে। সেটা আমরা পুরোটাই ভুলে যাই। আমাদের ৫টি সমস্যা থাকলে ১০ সম্ভাবনা আছে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে সমন্বিত এবং যথাযথ উদ্যোগের অভাবে আমরা সমম্ভাবনাগুলো ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছিনা। এবার আসছি একটি সাপ্লাই চেইন তৈরী করার জন্য কি কি ইতিবাচক দিক রয়েছে।

০১. ঘনবসতি: আমাদের দেশের ঘণবসতি আমাদের জন্য একটা সুবিধা, কোনো কোনো গ্রামের বসতি কোনো দেশের শহরের তুলনায় ঘণ। এই সুবিধাটাই্ আমরা নিতে পারি, ভারত পাকিস্তানের কিছু কিছু এলাকায় এমনকি আমেরিকা কানাডায় কোনো কোনো অঞ্চলে ৪০ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে যে লোক বাস করে বাংলাদেশ ৪ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে তারচেয়ে বেশী লোক বাস করে। তারমানে হলো আপনি কানাডার ঐ অঞ্চলে ব্যবসা করলে ১০ হাজার লোককে সার্ভিস দিতে ৪০ কিলোমিটার পাড়ি দিতেন, আর বাংলাদেশে সমপরিমাণ লোককে সার্ভিস দিতে ৪ কিলোমিটার পাড়ি দিলে হবে। আবার আপনি এলাকা ভিত্তিক এজেন্ট নিয়োগ দিতে চাইলে আপনার অর্ডারের উপর ভিত্তি করে ঢাকা শহরে ২ জন থেকে ২শজন এজেন্ট নিয়োগ দিলে এক কোটির বেশী মানুষকে সেবা দিতে পারবেন। ঘণবসতি না হলে এখানে ৫ গুন বেশী লোক প্রয়োজন হবে।

০২. পত্রিকা হকার: আমাদের দেশের দৈনিক পত্রিকার নেটওয়ার্ক গ্রামের বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। যদি দেশের ৫ হাজার ইউনিয়নে ১৫ হাজার হাট বাজার থাকে। তাহলে এই হাটবাজারে প্রতিদিনের প্রত্রিকা বেশীরভাগ এলাকায় দুপুর ১২টার মধ্যে পৌছে যায়। কোথায়ওবা ৩টা ৪ টা বাজে। পত্রিকা ডেলিভারী দেয়ার পর হকাররা তাদের নিজস্ব কাজ কর্ম করে। প্রায় ৩০ হাজার জনশক্তি এ কাজের সাথে জড়িত। সম্মিলিত উদ্যোগে আপনি এই বিশাল নেটওয়ার্ককে কাজে লাগাতে পারেন। আপনার ২/৩ হাজার টাকা দামের পন্য এরা মেরে দেবেনা।

০৩. ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র: সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় দেশের সব ইউনিয়নে তথ্যকেন্দ্র খুলেছে। এখানে ইন্টারনেট সেবা আছে, কম্পিউটার কম্পোজ, ফরম ফিলাপ, এসবও করে। এখানে একজন স্বাধীন কর্মী আছে। যে তালিকাভুক্ত হলেও সরকারের কর্মচারী নয়। সে নিজের ইচ্চেমতো ইকমার্স বা আইটির যেকোনো বৈধ সেবা মানুষকে দিতে পারবে। আপনি তাকে আপনার একজন এজন্ট হিসেবে নিয়োগ করুন। তিনি আপনার পন্যের মার্কেটিং এবং ডেলিভারী দুটোই করতে পারবে। তাকে কেস টু কেস পেমেন্ট করুন।

০৪. ছাত্রদের পার্টটাইম কাজ: বাংলাদেশে সব জায়গায় এখন শিক্ষার আলো পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অল্পকিছু আয় রোজগার করতে হয়। ঢাকা শহরে যেমন টিউশনি রয়েছে। দেশের অনেক এলাকায় এমন মেলেনা। আবার রেটও কম। এসব কলেজ ছাত্রদের নিয়ে আপনি প্রতি গ্রামেই একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করুন। যে স্থÍনীয়ভাবে আপনার বিপনন করবে। এবং আপনার প্রেরিত অর্ডার ভোক্তার কাছে পৌছে দেবে। যার একটা সাইকেল আছে তাকে যোগ্য বিবেচনা করুন। তিনি কুরিয়ার বা পোস্টঅফিস থেকে কালেকশান করে অথবা কোনো পরিবহনের কাউন্টার থেকে কালেকশান করে ভোক্তাকে পৌছে দেবেন। এবং সে এলাকার কোনো পন্য আপনি কিনতে চাইলে সেটা তার মাধ্যমে কিনতেও পারেন। তার বায়োডাটা ও সমস্ত কাগজপত্র রাখুন। সে তার লেখপড়া ফেলে আপনার ৫/৬ হাজার টাকা দামের পন্য নিয়ে চলে যাবেনা।

০৫. পোস্টমাস্টার: অনেকেই জেনে থাকবেন যে, পোস্ট অফিসে কর্মরত পোস্টমাস্টাররা পোস্টম্যানের মতো সরকারী কর্মচারী নয়। তারা স্বাধীন পেশাজীবির মতো সরকারের ডাক বিভাগের একজন প্রতিনিধি মাত্র। ৫ বছর আগেও তাদের সম্মানী ছিলো ৭ শ টাকা। এখন সম্ভবত ১৫শ। আপনারা দেখে থাকবেন এরা শুধু একবারের জন্য অফিসে আসে। সারাদিন কিংবা অফিস টাইমে বসে থাকা তাদের ডিউটি নয়। আরেকটি তথ্য জানাই গত বছর চারেক আগে বাংলালিংক এর পক্ষ থেকে এদের প্রত্যেককে একটি করে সিম দেয়া হয়েছে। আরো একটি তথ্য হলো ডাচবাংলা মোবাইল ব্যাংক, এবং বিকাশ এর চাইতে এরা অনেক কম খরচে টাকা ট্রান্সফার করে থাকেন। আপনার এজেন্ট যদি হোন একজন পোস্টমাস্টার তাহলে টাকা পাওয়ার টেনশন তো আমি দেখছিনা। আর পোস্টমাস্টার কিন্তু সম্ভ্রান্ত দেখে নিয়োগ দেয়া হয়। যেহেতু সরকারী সম্মানী কম সেজন্য দেখা হয় যে তার আর্থিক সামর্থ কেমন। আর আর্থিক সামর্থ যার নেই তিনি ১৫শ টাকা বেতনের কাজ করতে যাবেন কেন? তাছাড়া আপনি যখন ডাকে পন্য পাঠাবেন সেখানে লেখা থাকবে – পাবেন পোষ্টমাস্টার মহোদ্বয়—কুতুবখালী পোস্ট অফিস, উপজেলা অমুক, জেলা তমুক। তাহলে আমার ধারণা ডাকবিভাগ সে ডাক সঠিকভাবে ডেলিভারী করবে।এবার আপনি আপনার গ্রাহককে বলুন সেটা টাকা দিয়ে সংগ্রহ করতে।

০৬. ডাকবিভাগের সেবা: আমরা যাই বলি এখনো ডাক বিভাগ কমমূল্যে এবং সবচেয়ে বেশী মানুষকে সেবা দিচ্ছে। এখনো জিপিওতে গেলে লাইন ধরতে হয়। সময়ের হিসাবে একটু সমস্যা হয়। তানাহলে ডাকবিভাগে ডেলিভারী হয়। ২/১টা ব্যতিক্রম রয়েছে। এটা সবার ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে এখণ যেহেতু টেলিফোনের যুগ আপনার নিকট যদি পোস্টম্যানদের ফোন ডাটা থাকে। তাহলে মনিটরিং এর মাধ্যমে আপনি টাইম প্রবলেম এবং ডেলিভারি তদারকি করতে পারেন।

০৭. মোবাইল ব্যাংক: সারাদেশে বিকাশ এবং অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকের প্রায় ৫০ হাজার নিয়মিত এজন্ট রয়েছে। এরা স্থানীয় ই ফিল ব্যবসায়ী। আপনার ব্যবসার জন্য আপনি এই বিশাল নেটওয়ার্ক কাজে লাগাতে পারেন। এদেরকেও আপনি এজন্টশীফ দেয়ার মাধ্যমে তাদের ট্রেড লাইসেন্স, ন্যাশনাল আইডি, ইত্যাদি কাগজপত্র রেখে কেস টু কেস ভিত্তিতে এজেন্ট নিয়োগ করতে পারেন। আপনার গ্রাহক বা কাস্টমার তার ঘরের কাছে যে এজেন্ট আছে তার ঠিকানা দেবে। এজন্য একটি কমন সাইন থাকবে যা দেখে গ্রাহক বুঝবে ইনি ই কমার্স এজেন্ট। তারপর এজেন্ট এর কাছ থেকে টাকা দিয়ে কাস্টমার পন্য গ্রহণ করবে। আর গ্রাহক আপনার টাকা তার কমিশন রেখে বাকীটা বিকাশ করে দেবে। খুব বেশী কঠিন কিনা আপনারাই বলুন।

০৮. কুরিয়ার এজন্ট: আরো সহজ রাস্তা চাইলে দেশের বিভিন্ন কুরিয়ার এজেন্টকে আপনি আপনার এজেন্ট করে নিন। অথবা সম্মিলিতভাবে সব ই কমার্স পন্য ডেলিভারি দেয়ার জন্য ই ক্যাবের মাধ্যমে উপরের পরামর্শের আলোকেও আপনি এজন্ট নিয়োগ দিতে পারেন। সবাই একটা কমন সাইন দিয়ে কাজ করলে সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।

০৯. পরিবহন কাউন্টার: বাংলাদেশে সব জায়গা থেকে ঢাকায় বাস আসে। যেখান থেকে বাস ছাড়ে সেখানে বাসের স্থায়ী কাউন্টার রয়েছে। আপনি ১০-১৫টা বাসমালিকের সাথে চুক্তি করতে পালে বাংলাদেশর ৭০ভাগ এলাকা কভারেজ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে বাসের মাধ্যমে পন্য কাউন্টার পর্যন্ত চলে যাবে সেখান থেকে গ্রাহক রিসিভ করবে। এটা আমাদের জন্য সুবিধা এমনটা খুব কম দেশেই আছে যে দেশের সব এলাকা থেকে রাজধানীতে সরাসরি বাস যায়। আর মালিকের সাথে চুক্তির মাধমে কাজ করলে তাতে প্রতারিত হওয়ার আশংকা থাকবেনা।

১০.নিজস্ব নেটওয়ার্ক: কেউ যদি মনে করেন কারে কাছে যাবো কেনই যাবো? যদি এজেন্টশীফ বা তৃতীয়পক্ষই দরকার হয়। তাহলে বিকাশ আর ফ্লেক্সি লোড এজেন্ট এর কি দরকার তারা যেভাবে করেছে। আমিও সেভাবে পত্রিকায় এড দিয়ে বা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এজেন্ট করে নেবো। তাহলেও নিশ্চই সম্ভব। সেজন্য আপনি তৃতীয়পক্ষের সহযোগিতা নিতে পারেন। ব্যাংকগুলো সাধারণত তৃতীয় একটা কোম্পানীর হেল্প নিয়ে এই এজন্ট নেটওয়ার্ক দাড় করায়।

১১. অন্যান্য: এছাড়া রয়েছে দেশে ৫ হাজারের মতো সমবায় সমিতি। এরাও এ ধরনের কাজ করতে আগ্রহী হবে। রয়েছে স্থানীয় বনিক সমিতি। এদের সাহয্যও নিতে পারেন। রয়েছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতি, এদের সাথে কথা বলেও দেখতে পারেন।

শুধুমাত্র বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি এতগুলো সম্ভাবনা থাকে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে নিশ্চয় আরো বেশী সুবিধা অপক্ষো করছে। আর শিক্ষিত বেকারশ্রেনীর ক্রমবদ্ধমান বৃদ্ধিতে ই কমার্স ছাড়া আর গতি কি বলুন?

Comments

comments

About The Author



Freelance Consultant, Writer and speaker . Jahangir Alam Shovon has been in Bangladeshi Business sector as a consultant, He has written near about 500 articles on e-commerce, tourism, folklore, social and economical development. He has finished his journey on foot from tetulia to teknaf in 46 days. Mr Shovon is social activist and trainer.

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *