ফ্লিপকার্ট: ভারতের এক নম্বর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান

1376

গত সোমবার (জানুয়ারি ৯, ২০১৭) তারিখে কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তিকে ফ্লিপকার্টের নতুন সিইও হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। ভারতে অনলাইনে কেনাকাটাকে জনপ্রিয় করে তুলতে ফ্লিপকার্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফ্লিপকার্ট ভারতে ২০১০ সালে ক্যাশ-অন-ডেলিভারি কনসেপ্ট চালু করে এবং একে জনপ্রিয় করে তোলে। ফ্লিপকার্ট ভারতে অনলাইনে  ডিসকাউন্টে নামী ব্রান্ডের স্মার্টফোন বিক্রী করে দারুণভাবে সফল হয়। এই পোস্টে আমি আপনাদের সামনে ফ্লিপকার্টের কাহিনী তুলে ধরব।

flipkart-livemint-2014-article

প্রতিষ্ঠানের নাম: ফ্লিপকার্ট

ওয়েবসাইট:  www.flipkart.com

হেডকোয়ার্টার: ব্যাঙ্গালোর, কর্ণাটক

কর্মচারীর সংখ্যা: ৩০,০০০ কর্মচারী (২০১৬)। কর্মচারীর সংখ্যার দিক থেকে বর্তমানে ভারতে ফ্লিপকার্ট সর্ববৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।

পণ্য: বর্তমানে ফ্লিপকার্ট তাদের অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ৮০টির বেশি ক্যাটেগরিতে ৮ কোটি পণ্য বিক্রী করে থাকে।

মাসিক ডেলিভারির সংখ্যা: ৮০ লক্ষ।

রেজিস্টার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা: ১০ কোটি

ডেইলি পেইজ ভিজিট: ১ কোটি

সেলারের সংখ্যা: ১ লক্ষ

ওয়্যারহাউজ: ২১ টি।

প্রতিষ্ঠাকাল: ২০০৭

প্রতিষ্ঠাতা: শচীন বানসাল (Sachin Bansal) এবং বিন্নী বানসাল (Binny Bansal) দুজনে ইন্ডিয়ান ইনসটিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি)দিল্লী এর ছাত্র ছিলেন। তারা অ্যামাজন ডট কম এ চাকুরি করতেন। ২০০৭ সালে তারা দুজনে মিলে ফ্লিপকার্ট প্রতিষ্ঠান করেন। এখানে বলে রাখি তাদের দুজনের বাড়িই ভারতের চন্ডীগড়ে কিন্তু তারা আত্মীয়র সম্পর্কে সম্পর্কিত নয়। অ্যামাজন এর মতো ফ্লিপকার্টও প্রথমে বই বিক্রী দিয়ে তাদের ব্যবসা শুরু করে এবং সেখান থেকে আস্তে আস্তে ব্যবসা বাড়ায়।

বিনিয়োগকারী: ফ্লিপকার্টের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক হেজ ফান্ড প্রতিষ্ঠান টাইগার গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট। এই প্রতিষ্ঠানটি ফ্লিপকার্টের ৩০%-৩৩% স্টেকহোল্ডার। ফ্লিপকার্টের বোর্ড মেম্বার এবং অ্যাডভাইজরদের মধ্যে টাইগার গ্লোবালের লি ফিক্সেল (Lee Fixel) আছেন। ফ্লিপকার্টের অনেক সিদ্ধান্ত টাইগার গ্লোবালই নিয়ে থাকে।অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আছে, ন্যাসপার্স, ডিএসটি গ্লোবাল, স্টিডভিউ ক্যাপিটাল, এবং অ্যাকসেল পার্টনার্স। ফ্লিপকার্টে শচীন এবং বিন্নীর স্টেক এর পরিমাণ ১৪-১৫%।

lee-fixel

ফ্লিপকার্টের বিনিয়োগ এবং পোর্টফোলিও সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই লিঙ্কে ভিজিট করুন: www.crunchbase.com/organization/flipkart#/entity

ফ্লিপকার্টের বর্তমান সিইও কল্যান কৃষ্ণমূর্তি সম্পর্কে: জানুয়ারির ৯ তারিখে  কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তি (Kalyan Krishnamurthy) কে ফ্লিপকার্টের নতুন সিইও হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তার তিনদিন পরেই তিনি তার ৪৫তম জন্মদিন উদযাপন করেন। জন্মদিনে এর চেয়ে দারুণ উপহার আর কি হতে পারে? বর্তমানে তিনি ফ্লিপকার্টের ক্যাটেগরি ডিজাইন অর্গ্যানাইজেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন।

kalyan1-ko4f-621x414livemint

Kalyan Krishnamurthy

কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তি ২০০০ সালে এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট থেকে এম বি এ এবং ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে পড়ালেখা করেছেন।

কৃষ্ণমূর্তি প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল এর সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স এর দায়িত্বে ছিলেন, তিনি হংকং-এ সাত বছর ধরে ই-বে এর এশিয়া-প্যাসিফিক অপারেশনের এর ফ্যাইন্যান্সের তত্ত্বাবধানের ছিলেন। ২০১১ সালে কৃষ্ণমূর্তি টাইগার গ্লোবালে যোগ দেন। তিনি টাইগার গ্লোবাল এর একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। টাইগার গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের গ্লোবাল হেড লি ফিক্সেল কৃষ্ণমূর্তিকে ফ্লিপকার্টে নিয়ে আসেন।

কৃষ্ণমূর্তির বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি অঙ্কে ভাল এবং ই-কমার্স সম্পর্কে খুব ভাল জ্ঞান রাখেন এবং দারুণ পরিশ্রমী। অনেক লম্বা সময় ধরে তিনি অফিসে কাজ করেন। একইসাথে তিনি খুবই সোজাসাপ্টা কথা বলেন এবং নির্মম প্রকৃতির। এসব কারণে ফ্লিপকার্টের কর্মীরা তাকে পছন্দ করে।  সাধারণত উদ্যোক্তাদের চিন্তা থাকে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা কিন্তু কৃষ্ণমূর্তি ব্যতিক্রম। তিনি “Short Term Fix” এর উপরে বেশি জোর দেন। তিনি বাস্তবসম্মত চিন্তা-ভাবনা করেন। যেটা অর্জন করা যায় সেটার উপরে জোর দেন।

ফ্লিপকার্টের উত্থান পতনের গল্প

২০০৭২০১৫: এই আট বছরে ফ্লিপকার্টের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শচীন বানসাল। শচীনের নেতৃত্বে ফ্লিপকার্টের ব্যবসা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৪ কোটি রুপির পণ্য বিক্রী করে। ২০০৯-২০১০ সালে সেটাই বেড়ে ২০ কোটি রুপিতে পৌছায়।২০১৩ সালের মধ্যেই ফ্লিপকার্ট ভারতের বৃহত্তম ই-কমার্স স্টার্ট-আপ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এর ভ্যালুয়েশন তখন ১ বিলিয়ন ডলার এবং প্রতিষ্ঠানটি ২০০ মিলিয়ন ডলার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড লাভ করে।

Sachin Bansal Executive Chairman & Co- Founder, Flipkart. During the Carnegie India Global Technology Summit 2016 in bangalor on 07.12.16, pic by Hemant Mishra/mint

Sachin Bansal Executive Chairman & Co- Founder, Flipkart 

কিন্তু প্রদীপের নীচেই থাকে অন্ধকার। ফ্লিপকার্টের এই ধুমকেতুর মতো উত্থান প্রতিষ্ঠানটির জন্যে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।ফ্লিপকার্টের ভবিষ্যত স্ট্রাটেজি নির্ণয় করার ক্ষেত্রে শচীন খুব বড় ধরণের ভুল করে বসেন। ফলে ফ্লিপকার্ট প্রচুর লস করছিল প্রতিমাসে এবং বিক্রীও আশানুরুপ হচ্ছিল না।একই সময়ে ভারতীয় সরকারও প্রতিষ্ঠানটিতে বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে তদন্ত শুরু করে দেয়। অন্যদিকে অ্যামাজন তখন ভারতে আসি আসি করছে।

শুরুর দিকে ফ্লিপকার্ট অ্যামাজনের স্টাইল ফলো করে। ফ্লিপকার্ট ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড থার্ড পার্টি সেলারদের কাছে পাইকারি হারে পণ্য বিক্রী করে থাকে। অন্যদিকে ফ্লিপকার্ট ইন্টারনেট প্রাইভেট লিমিটেড যার অধীনে ফ্লিপকার্টের অনলাইন মার্কেটপ্লেস সেটি সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রী করে থাকে। এভাবে ফ্লিপকার্ট তাদের অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিশাল পণ্যের সমাহার গড়ে তোলে। ফ্লিপকার্ট তাদের পণ্য ও সার্ভিসের উপরে গুরুত্ব দেয় এবং ভারতের অনলাইন ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পরে শচীন বানসাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে ফ্লিপকার্টকে একটি পুরো মাত্রার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবেন। অর্থাৎ ফ্লিপকার্ট কোন পণ্য বিক্রী করবে না শুধুমাত্র বিক্রী করার একটি প্ল্যাটফর্ম হবে যেখানে জিওম্যাপিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রেতা ও মার্চেন্টকে যুক্ত করা হবে এবং বিভিন্ন সফট সার্ভিস প্রদান করবে। আর এই সিদ্ধান্ত থেকেই তিনি ফ্লিপকার্টকে মোবাইল অনলি করার সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ ফ্লিপকার্ট এর কোন ডেস্কটপ ওয়েবসাইট থাকবে না। কেবল মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন থাকবে।লক্ষ্য অনুযায়ী তিনি ফ্লিপকার্ট কে শচীন তিনটি ইউনিটে ভাগ করেন।

সম্প্রতি এক বিবৃতিতে ফ্লিপকার্টের দাবি, গত কয়েক মাস ধরেই মোবাইলের মাধ্যমে পণ্য কেনার চাহিদা বাড়ছে ভারতে আগামী দিনে তা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পাশাপাশি, দেশের বেশির ভাগ মানুষই এখন স্মার্ট ফোন ব্যবহারে অভ্যস্ত ফ্লিপকার্টেও ৭০৭৫ শতাংশ ক্রেতাই অ্যাপের মাধ্যমে পণ্য বাছাইয়ের সুযোগ নিচ্ছেন যে কারণে এই উদ্যোগ তবে আপাতত ওয়েবসাইট এবং অ্যাপউভয় ব্যবস্থাই চালু রাখছে তারা (আনন্দবাজার জুলাই ২০১৫)

কিন্তু শচীনের এই সিদ্ধান্ত  ফ্লিপকার্টের জন্যে বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিক্রী কমে যায় এবং ফ্লিপকার্ট এর কাস্টমার সার্ভিসের দারুণ সুনাম ছিল সেটাও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

ঠিক ঐ সময়ে ফ্লিপকার্টে আবির্ভাব ঘটে কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তির। ২০১৩ সালের মে মাসে কৃষ্ণমূর্তি ফ্লিপকার্টে যোগ দেন। প্রথমে ইনটেরিম ফাইন্যান্স চীফ পরে হেড অব সেলস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কৃষ্ণমূর্তির সোজাসাপ্টা ব্যক্তিত্ব। তার চেয়ে বড় কথা তিনি কেবল তার অফিসে বসে স্ট্রাটেজি তৈরি করতেন না। তিনি প্রতিটি অধস্তন কর্মচারীদের সাথে সরাসরি কথা বলতেন। প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানে কি কি কাজ হচ্ছে তা সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখতেন।প্রতিটা কর্মচারীর কি কাজ তা সম্পর্কে তিনি খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করতেন। একই সাথে ই-কমার্স সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল গভীর। এই দুয়ে মিলে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই ফ্লিপকার্টের কর্মীদের মন জয় করে নেন। তার নেতৃত্বে ফ্লিপকার্টের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ায়।

২০১৪ সালে ফ্লিপকার্ট বিলিয়ন ডলার ফান্ডিং পায়। ঐ বছরে ফ্লিপকার্ট ফ্যাশন পোর্টাল মিন্ত্রাকে ৩৩০ মিলিয়ন অ্যাকোয়ার করে নেয়। মিন্ত্রার প্রতিষ্ঠাতা মুকেশ বানসাল (Mukesh Bansal)এর পরে ফ্লিপকার্টে যোগ দেন।

mukesh-bansal

Mukesh Bansal

ঐ বছরের অক্টোবরে ফ্লিপকার্ট তাদের প্রথম বিগ বিলিয়ন ডে সেল উদযাপন করে এবং ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য বিক্রী করে। ফ্লিপকার্ট ভারতের প্রথম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান যাদের বিক্রী বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। বিগ বিলিয়ন ডে সেল চীনের আলিবাবা সিঙ্গলস ডে এর মতো একটি দিবস। কিন্তু ২০১৪ সালে কৃষ্ণমূর্তি চলে যান কারন শচীন বানসালের সাথে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়।কৃষ্ণমূর্তি টাইগার গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টে কাজ করতেন।ফ্লিপকার্টের সমস্যা শুরু হবার পরে লি ফিক্সেলই তাকে ফ্লিপকার্টে নিয়ে আসেন।যদিও কৃষ্ণমূর্তির নেতৃত্বে ফ্লিপকার্টের ব্যবসা ভাল হয় কিন্তু লি ফিক্সেল শচীন বানসালের সাথে কোন বিরোধে জড়াতে চান নি তাই কৃষ্ণমূর্তির চলে যাওয়াটা তিনি মেনে নেন।

২০১৫ তে ফ্লিপকার্টের ভ্যালুয়েশন পৌছায় ১৫.২ বিলিয়ন ডলারে এবং ভারতের সবচেয়ে দামী স্টার্ট-আপে পরিণত হয় ফ্লিপকার্ট।কিন্তু ফ্লিপকার্টের ব্যবসা ভাল যাচ্ছিলনা। বিক্রী বৃদ্ধি পাচ্ছিল না এবং লস এর পরিমাণও প্রচুর বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০১৪-২০১৫ সালে ফ্লিপকার্ট লস দিয়েছিল ২০০০ কোটি রুপি।এমনকি ফ্লিপকার্টের বিগ বিলিয়ন ডলার সেলস ও ভাল হয় নি। ভারতে ফ্লিপকার্টই অনলাইনে বিভিন্ন নামী ব্রান্ডের পণ্য এক্সক্লুসিভ ভাবে বিক্রী করার কনসেপ্টকে জনপ্রিয় করে। শুরুতেই বলেছি যে নামী ব্রান্ডের স্মার্টফোন অনলাইনে ফ্লিপকার্ট ভাল ডিসকাউন্ট দিয়ে সফলতার সাথে বিক্রী করে। মটোরোলা, জিয়াওমি এর মতো নামী কঞ্জ্যুমার ইলেকট্রনিক ব্রাণ্ড তাদের পণ্য ফ্লিপকার্টের মার্কেটপ্লেসে বিক্রী করত কিন্তু ২০১৫তে ফ্লিপকার্টের ব্যবসা পড়ে যাবার কারণে এরকম অনেকগুলো ব্রাণ্ড তখন প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কেটপ্লেসে চলে যায়।

২০১৬: ফ্লিপকার্টের অবস্থার উন্নতির জন্যে বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির টপ ম্যানেজমেন্টে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেন। এরই ফলশ্রুতিতে জানুয়ারি মাসে বিন্নী বানসালকে সিইও পদে উন্নীত করা হয় এবং শচীন বানসাল কে একজিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। মুকেশ বানসাল ফ্লিপকার্ট থেকে বের হয়ে আসেন। এ বছরে ফ্লিপকার্টের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ৫ কোটিবার ডাউনলোড হয় এবং তাদের রেজিস্টার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি অতিক্রম করে।

binny-bansal

Binny Bansal

দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে বিন্নী বানসাল প্রথমে লস এর পরিমাণ কমান। বিন্নী শচীনের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পুরানো ইনভেন্টরি-ভিত্তিক মডেল এর উপরে জোর দেন। বিন্নী সিইও নিযুক্ত হবার পরে তার সামনে তিনটি লক্ষ্য ছিল- বিক্রী বাড়ানো, লস কমানো এবং কাস্টমার সার্ভিসের উন্নতি সাধন। কিন্তু তিনি এসব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হন।

২০১৬ এর ফেব্রুয়ারি মাসে মর্গান স্ট্যানলি ফ্লিপকার্টের ভ্যালুয়েশন কমিয়ে ১১ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে আসে। পরে ভ্যালুয়েশন আরো পড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌছায়। আগেই বলেছিলাম যে ফ্লিপকার্ট লস দিয়ে বাজার বৃদ্ধি করছিল। প্রতিদিনের ব্যবসা চালাতে তাদের প্রচুর খরচ হচ্ছিল এবং এর জন্যে নতুন বিনিয়োগের দরকার। আবার বিক্রীও সেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল না। বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছিল না।

তার উপরে অ্যামাজন আস্তে আস্তে ফ্লিপকার্টের বাজার দখল করে নিচ্ছিল। ২০১৬ এর জুলাই মাসে প্রথম বারের মতো অ্যামাজন ইন্ডিয়া গ্রস সেলস (value of products sold on an online platform after discounts)-এ ফ্লিপকার্টকে ছাড়িয়ে যায়। আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসেও অ্যামাজন তাদের এই ধারা অব্যাহত রাখে।

এসবের ফলে ফ্লিপকার্টের বিনিয়োগকারীরা অস্থির হয়ে উঠেছিল। লি ফিক্সেল(Lee Fixel)টাইগার গ্লোবাল এর নামী একজন বিনিয়োগকারী। ফিক্সেল ফ্লিপকার্টে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। ফ্লিপকার্টের এহেন দুরবস্থা তার সুনাম ক্ষুণ্ন করবে। অবস্থা তখন খুবই খারাপ।

এ অবস্থায় আবার ত্রাণকর্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হন কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তি। ২০১৬ সালের জুন মাসে কৃষ্ণমূর্তি বিক্রয় বিভাগের প্রধান হিসেবে ফিরে আসেন। ২০১৪ তে তিনি ফ্লিপকার্ট থেকে বের হয়ে টাইগারের ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে কাজ করতে থাকেন তবে তিনি ফ্লিপকার্টের পরিচালক বোর্ডে ছিলেন এবং বেশ কয়েকজন একজিকিউটিভ এর সাথে তার ভাল সম্পর্ক ছিল। ফ্লিপকার্টের এই দুঃসময়ে কি করতে হবে তা নিয়ে কৃষ্ণমূর্তির পরিস্কার ধারণা ছিল এবং বোর্ডের অন্যান্য পরিচালক এবং বিনিয়োগকারীরাও তার উপরে ভরসা করছিল।

কৃষ্ণমূর্তি র মূল লক্ষ্য ছিল ফ্লিপকার্টের বিক্রী বাড়ানো এবং খরচ কমিয়ে আনা।দায়িত্ব নেবার পরে প্রথম এক সপ্তাহ তিনি ফ্লিপকার্টের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানের সাথে মিটিং করেন এবং কার কি দায়িত্ব, কার কি কাজ সব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন।তিনি প্রতিষ্ঠানের একজিকিউটিভদের সাথে মিটিং করেন। দায়িত্ব নেবার পরপরই তিনি চারজন সিনিয়র একজিকিউটিভকে ছাঁটাই করে দেন যার মধ্যে দুজন তারই হাতে গড়া লোক ছিল যারা ২০১৩ সালে তার সাথেই কাজ করেছিল। কৃষ্ণমূর্তি একটা ব্যাপার সবার কাছে স্পষ্ট করে দিলেন তোমরা যদি ভাল পারফর্ম করতে না পার এবং আশানুরূপ ফলাফল দিতে না পার তাহলে এখানে তোমাদের জায়গা নেই।

flipkart-ko4f-621x414livemint

এদিকে অক্টোবর মাস চলে আসছিল। ২ অক্টোবর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত বিগ বিলিয়ন ডে (বিবিডি) সেলস উদযাপন করবে ফ্লিপকার্ট। কৃষ্ণমূর্তির লক্ষ্য ছিল একটি সফল বিবিডি।কৃষ্ণমূর্তি অ্যামাজনের কোন কোন পণ্য কতটা বিক্রী হয়েছে এসব সম্পর্কে বিস্তারিত খবর রাখতেন।

কৃষ্ণমূর্তি নতুন কোন স্ট্রাটেজি গ্রহণ করেন নি বা ব্যাপক কোন পরিবর্তন আনেন নি। বিন্নী বানসাল যে বিজনেস মডেল দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন কৃষ্ণমূর্তি সেটাই করেছেন।অর্থাৎ সরাসরি পণ্য বিক্রী এবং থার্ড পার্টি সেলারদের কাছে পণ্য বিক্রী সেটাই তিনি করেছেন তবে তার মূল সাফল্য ছিল সুস্পষ্ট লক্ষ্য স্থির করা এবং সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা এবং লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক চেষ্টা করা।তিনি রিটেইল এর উপরে গুরুত্ব আরোপ করেন।

অ্যামাজন ইন্ডিয়ার সাথে ছোট ছোট আইটেম বিক্রী করে ফ্লিপকার্ট কুলিয়ে উঠতে পারবে না তাই কৃষ্ণমূর্তি বাছা বাছা দামী ব্রান্ডের পণ্য যেমন ফ্রিজ, টিভি, এস, দামী স্মার্টফোন (বিগ টিকেট আইটেম) বিক্রীর উপরে জোর দেন। এসব দামী পণ্য গুলোতে তিনি আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট দেন এবং একই সাথে দ্রুত ডেলিভারি এবং কাস্টমার সার্ভিসের উপরে জোর দেন।

আগেই বলেছি যে ফ্লিপকার্টের সাথে অনেক বড় বড় ব্রান্ডের এক্সক্লুসিভ চুক্তি ছিল কিন্তু পরে তারা অন্য মার্কেটপ্লেসে চলে যায়। ভারতে অনলাইনে যেসব দামী পণ্য বিক্রী হয় তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি হচ্ছে স্মার্টফোন। কৃষ্ণমূর্তি নিজে জিয়াওমি, মটোরোলা সহ নামী স্মার্টফোন ব্রান্ডগুলোর সাথে মিটিং করেন এবং তাদের পণ্য ফ্লিপকার্টের প্ল্যাটফর্মে এক্সক্লুসিভ ভাবে বিক্রী করতে রাজি করান।

এছাড়া বিবিডি কে সফল করার জন্যে কৃষ্ণমূর্তি ১৫-সদস্য বিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স তৈরি করেন। এই টাস্কফোর্সে তিনি ফ্লিপকার্টের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বাছা বাছা একজিকিউটিভদের নিয়ে আসেন। যাদের কাজের রেকর্ড ভাল এবং কিছু বললে সাথে সাথে করতে পারে তারাই এই টাস্কফোর্সে ছিল। এই টাস্কফোর্সের কাজ ছিল বিগ বিলিয়ন ডে উপলক্ষে সব কাজ যে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়। ফ্লিপকার্ট ক্রেতাদের কাছে যে সার্ভিসের আশ্বাস দেবে তা যেন তারা ঠিকমতো দিতে পারে তা নিশ্চিত করাই ছিল এই টাস্কফোর্সের দায়িত্ব।

67347-shopping-4-10-16

Image source: Zee News

যাই হোক, এত প্রতিকূলতার পরেও ঠিকই ফ্লিপকার্ট ২০১৬ সালে অক্টোবর ২ থেকে অক্টোবর ৬ পর্যন্ত সফল বিগ বিলিয়ন ডে সেলস উদযাপন করেন। অ্যামাজন ইন্ডিয়াও ১ অক্টোবর থেকে ৫ অক্টোবর দ্যা গ্রেট ইন্ডিয়ান ফেস্টিভ্যাল সেলস উদযাপন করে। পুরো মাস জুড়েই ফ্লিপকার্ট এবং অ্যামাজন ইন্ডিয়া তাদের এই ফেস্টিভ্যাল চালাতে থাকে। ফ্লিপকার্ট এবং তাদের ফ্যাশন প্ল্যাটফর্ম মিন্ত্রা এবং জাবং মিলে অক্টোবর মাসে ৫০০০ কোটি রুপির গ্রস সেলস করে। অন্যদিকে অ্যামাজন ইন্ডিয়ার গ্রস সেলস এর পরিমাণ ছিল ৪০০০ থেকে ৪,৫০০ কোটি রুপি।

২০১৬ এর বিগ বিলিয়ন ডে সফল হবার পরে কৃষ্ণমূর্তি সম্পর্কে আর কারোরই কিছু বলার ছিল না। গত বছরের আগস্ট মাসের শেষে ফ্লিপকার্টের টপ ম্যানেজমেন্টে আবার পরিবর্তন আনা হয়। কৃষ্ণমূর্তিকে ফ্লিপকার্টের মার্কেটপ্লেস, রিটেইল, এবং বিজ্ঞাপন ব্যবসার প্রধান নিযুক্ত করা হয়। এছাড়াও ফ্লিপকার্টের মার্কেটিং, প্রাইভেট লেবেল, মার্কেটপ্লেস অ্যান্ড কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স কৃষ্ণমূর্তিকে রিপোর্ট করবে।

অন্যদিকে বিন্নী ফ্লিপকার্টের লজিসটিক্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ই-কার্ট, ফ্লিপকার্টের প্রশাসন, প্রযুক্তি এবং ফাইন্যান্স দেখাশুনা করার দায়িত্ব পায়।

২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ফ্লিপকার্ট ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড এবং ফ্লিপকার্ট ইন্টারনেট প্রাইভেট লিমিটেড মিলিতভাবে  ২.২ বিলিয়ন ডলার আয় করে।

সর্বশেষ অবস্থা এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা: কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তি এখন ফ্লিপকার্টের সিইও। বিন্নী বানসাল ফ্লিপকার্ট গ্রুপের সিইও হিসেবে মার্জার, অ্যাকুইজিশন এবং বিভিন্ন ইউনিটে মূলধন বন্টনের তত্ত্বাবধানে থাকবেন এবং শচীন বানসাল একজিকিউটিভ চেয়ারম্যান পদেই বহাল থাকবেন স্ট্রাটেজিক নির্দেশনা প্রদান করবেন। শচীন বিন্নীর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। একই সাথে ফ্লিপকার্টের সিইও হিসেবে কৃষ্ণমূর্তি বিন্নীর সাথে কাজ করবেন।

অনন্ত নারায়নন (Ananth Narayanan) ফ্লিপকার্টের ফ্যাশন ইউনিট মিন্ত্রা এবং জাবং এর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

সমীর নিগম ফ্লিপকার্ট এর পেমেন্ট ইউনিট ফোনপে (PhonePe) এর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং বিন্নীর সাথে কাজ করবেন।

২০১৮-২০১৯ এর মধ্যে ফ্লিপকার্ট শেয়ার বাজারে তাদের প্রাথমিক গণ প্রস্তাবনা (আইপিও)ছাড়বে। তাই বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীরা ব্যবসাকে স্থিতিশীল করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফ্লিপকার্টকে শেয়ারবাজারে আসার যোগ্য করে তুলতে চান।

শেষকথা: এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে ফ্লিপকার্ট কি ভবিষ্যতে অ্যামাজন ইন্ডিয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের এক নম্বর অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কিনা ? এর কোন সোজাসাপ্টা উত্তর নেই। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা মেরিল লিঞ্চ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে যাতে তারা পূর্বাভাস দেয় যে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ফ্লিপকার্ট ভারতের ৪৪% মার্কেট শেয়ার ধরে রাখবে। মেরিল লিঞ্চ আরো বলেছে যে, ২০১৬ সালে অ্যামাজন ইন্ডিয়ার মার্কেট শেয়ার ২৮% থেকে ৩৭% বৃদ্ধি পাবে। অ্যামাজন ঘোষণা দিয়েছে যে তাদের ভারতের ব্যবসাতে তারা আরো ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। অ্যামাজন ইন্ডিয়াকে মোকাবেলা করার জন্যে কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তির নেতৃত্বে ফ্লিপকার্ট কি ধরণের কার্যপন্থা গ্রহণ করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র:

আনন্দবাজার পত্রিকা

ফার্স্টপোস্ট ডট কম

দ্যা ইকনোমিক টাইমস

লাইভমিন্ট (১)

লাইভমিন্ট (২)

এনডিটিভি গ্যাজেটস

বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

ফর্চুন ডট কম

 

লেখক: এস এম মেহদী হাসান

Comments

comments

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *