পন্য ডেলিভারী সেবায় এই সময়ের সমস্যাগুলো

431

ডেলিভারী কোম্পানীর জন্য এই সময়ের সমস্যাগুলো

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

গত কয়েকবছরে ই-কমার্স নিয়ে তরুনদের আগ্রহ তুঙ্গে। অনেকে ই-কমার্সে আসছেন, আবার ঝরে পড়ছেন। ই-কমার্সে যেসব সমস্যা রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলো ডেলিভারী সমস্যা। পন্য ডেলিভারী আর সিওডির টাকা নিয়ে একেবারে যা-তা অবস্থা। এই অবস্থা থেকে পরিত্রান দিতে নতুন কিছু উদ্যোক্তা লজিস্টিক বা কুরিয়ার সেবা নিয়ে এসেছেন। বলাবাহুল্য গত ২ বছরে অন্তত ১০টি পন্য ডেলিভারী সেবা ব্যর্থ হয়েছে। অনেকে সেবা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো মার্চেন্টদের টাকা শোধ করতে পারেন নি। কারো কারো পালিয়ে বেড়ানোর মত ঘটনা ঘটেছে।

ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ শুধুমাত্র ডেলিভারী সেবা সমস্যা সমাধানের জন্য আলাদা একটা কমিটি করেছে। যারা মার্চেন্টদের অভিযোগ শুনে লজিস্টিক কোম্পানীর সাথে কথা বলে সমস্যার সমাধান করতো। শুধু তাই নয়। কুরিয়ার কোম্পানীগুলোর বিরুদ্ধে যে পরিমাণ অভিযোগ জমা হয়েছে তাতে কুরিয়ার কোম্পানীর নতুন সদস্য নেয়া ই- ক্যাব বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের জন্য নতুন নীতিমালার প্রস্তাব করেছে যা এখনো আলোচনাধীন।

কেন এমনটা হয় বা হলো। আসুন সে আলোচনায় যাওয়া যাক:

হিসেব না করে কম দামে সেবা দেয়া:

কুরিয়ার কোম্পানীগুলো যখন ব্যবসা শুরু করে তাদের ধারণা যে মার্চেন্টরা তাদের পেছনে লাইন লেগে যাবে। কিন্তু মাস গড়ানোর পরও যখন এমন কোনো ঘটনা ঘটে না তখন তারা স্টাফের স্যালারী দেয়া এবং কাজ পাওয়ার জন্য খুব কম দামে কাজ নিতে থাকে। কিন্তু মাস শেষে দেখা যায়। ৫০ টাকা করে পন্য ডেলিভারী দিয়েছে আর ৭০ টাকা প্রতি ডেলিভারীতে খরচ পড়ে বসে আছে। তখন না যেতে পারে সামনে না পেছনে। আমার জানামতে ২০১৫ সালে একটি কুরিয়ার কোম্পানী এই ভুল করে তারা ব্যাংকগুলোতে ৫টাকা দরে ডকুমেন্ট ডেলিভারী করার কাজ নেয়। ফলে একদিকে কম টাকা আরেকদিকে সময়মত বিল না পাওয়া এবং টাকা কম বলে ভালো সার্ভিসও দিতে না পারা। কারণ ডেলিভারী পার্সনকে যখন চাপ দেয়া হলো দৈনিক ৪০টি ডাক দিতে হবে। তখন সে অনেক ডাক না দিয়ে হয়তো ড্রেনে ফেলে দিয়েছে। এতেকরে একসময় ওই ব্যাংক তার চুক্তিটাই বাতিল করেছে। এভাবে একসময় তাকে ব্যবসাটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

আরেকটি কোম্পানীর কথা জানি যারা ব্যবসায় বন্ধ না করলেও আপাতত স্থগিত করেছে। তাদের সমস্যা একই রকম- তাদের প্লান ছিলো প্রথম দিকে ৩৫ টাকা ডেলিভারী দিয়ে তারা বাজার ধরে ফেলবে তারপর অন্যরা যখন সরে যাবে তখন তারা রেগুলার রেট দিয়ে ব্যবসায় শুরু করবে। কিন্তু মাস শেষে কর্মচারীদের বেতন দেয়া তাদের সম্ভব হয়নি। অন্য খরচতো আরো দুরে।

 

অন্যের টাকা দিয়ে ব্যবসা করার প্লান:

কেউ যখন বর্তমানে ই-কমার্সের ও এফ-কমার্সের পন্য ডেলিভারী ব্যবসার প্লান করে তখন তার ধারণা হয় যেহেতু কাস্টমারের টাকাটা আগে তার কাছে আসবে তারপর তিনি সেটা মার্চেন্ট পৌছে দেবেন। তাহলে তার নিজেরতো অনেক টাকা পুঁজির প্রয়োজন নেই। তাছাড়া মার্চেন্ট এর টাকাতো কয়দিন হাতে রাখা যাবে। এই পলিসি নিয়ে মাঠে নামার পর দেখা যায় মার্চেন্ট এর টাকা অফিসের কাজে খরচ করে বসে আর মার্চেন্টকে টাকা দেয়া যাচ্ছেনা। তখন তারা হিমসিম খান একদিকে কাস্টমার অসন্তুষ্ট হয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দেয় অন্য দিকে নিজেরাও টাকার জন্য সার্ভিস লেবেল উন্নত করতে পারে না। এবং শেষ পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়।

 

বাজার বিশ্লেষণ না করে ব্যবসা শুরু করা:

বেশীরভাগ কুরিয়ার কোম্পানীর কোন ধারণা আগে থেকে থাকে না যে। একটি কোম্পানী চালানোর জন্য তাকে দৈনিক কতগুলো বা মাসে কতগুলো ডেলিভারী প্রসেস করতে হবে। একজন ডেলিভারী এক্সিকিউটিভ দৈনিক কতগুলো ডেলিভারী দিতে পারবে। কোন কোন জেলায় কোন কোন এলাকায় অর্ডার বেশী আসে। ঈদে যখন বেশী অড়ার আসে তখন সেটা কিভাবে সামাল দেয়া হবে এটা নিয়ে কোনো ধারণাই তাদের থাকে না। ফলে ব্যবসায় নেমে হিমসিম খেতে হয়।

 

পেশাদার কর্মীর অভাব

বাংলাদেশে ই-কমার্সে পন্যের মূল্য ৩০০-৮০০ টাকার মধ্যে বেশী। আবার ফেসবুক ফেজে বেচাকেনা হয়। তাদের পন্যেরও দাম কম। ফলে কাস্টমার আসলে একটা ডেলিভারীর জন্য ৫০ টাকার বেশী দিতে চায়না সেক্ষেত্রে। যদি এখন ৬০ টাকায় চলতি রেট। কম টাকা সেবা দিয়ে কর্মীদের বেতনও কম দিতে হয় ৭/৮ হাজার। এর কারণে পেশাদার কর্মী পাওয়া যায়না। যাদের পাওয়া যায় তাদের সেবা শুধু খারাপ তা নয়। মানসিকতা ও নৈতিকতারিই দূরঅবস্থা। কেউ টাকা মেরে দেয়। কেউ পন্য নিয়ে উধাও কেউ বলে আমার বাইক ছিনতাই হয়ে গেছে। কেউ বলে কাস্টমার টাকা কম দিয়েছে। এ ধরনের কাজ হয়তো ১০০ জনে ২ জন করে কিন্তু তাতেইতো ব্যবসা এবং সুনামের ১২টা বেজে যায়।

ইত্যাদি নানা সমস্যা। যদিও যারা পরিস্থিতির শিকার হয়েছে তারা কৌশল বদলে নিয়েছে ইতোমধ্যে অনেকে বেতন কাঠামো ১০ হাজার এর বেশী করে দিয়েছে। এবং কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রনোদনার মধ্যে রেখেছে। এবং রেফারেন্স ছাড়া কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়না।

 

মার্চেন্টদের অপেশাদার মানসিকতা:

কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে যারা উদ্যোক্তা বা মার্চেন্ট তাদের অপেশাদার আচরণে বিরক্ত হয়ে অনেকে বিজনেস থেকে সরে গেছে। যেমন সঠিক ভাবে প্যাক না করা, ঠিকানা সঠিক না দেয়া, ঠিকানা যাচাই না করে প্রতারক চক্রের কাছে পন্য ডেলিভারী করতে পাঠানো, পন্য পিক করার জন্য দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখা, পন্য ডেলিভারী করতে দিয়ে বার বার ফোন করে ঠিকানা পরিবর্তন করা, অল্প টাকার জন্য বার বার বিরক্ত করা, টাকা পয়সার হিসেব সঠিক ভাবে না রেখে ডেলিভারী কোম্পানীকে দোষারোপ করা, ফোন দিয়ে বার বার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলা ইত্যাদি কারণে বেশীরভাগ লজিস্টিক সার্ভিস প্রোভাইডার বিরক্ত। বিশেষ করে এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের অনেকে যথেষ্ঠ ম্যাচিউরড নন।

 

কাস্টমারদের অযাচিত আচরণ:

একটি সুন্দর ও সফল লেনদেন এর অংশ কাস্টমার নিজে। আমাদের দেশে আর্থ সামাজিক ও দৃস্টিভঙ্গিজনিত সমস্যার কারণে কিছু কিছু নানা ভোগান্তিতে পেলেন ডেলিভারী কোম্পানীর লোকদেরকে। বার বার ঠিকানা পরিবর্তন, পন্য ডেলিভারী, ফেইক অর্ডার, পন্য ছিনতাই, পন্য ডেলিভারীর পর ফেরত দেয়া প্রতিনিয়ত এধরনের নানা সমস্যা তারা তৈরী করে থাকেন। ফলে পুরো প্রসেসটা জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে যায়। এবং একটি পন্য চুরি বা ছিনতাই হলে পরে তা নিয়ে যেমনি সময় নষ্ট হয় তেমনি সম্পর্কও নষ্ট হয়। কিছু কাস্টমারের মানসিকতা একটা সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটা সঠিকভাবে বোঝার জন্য ডেলিভারী উদ্যোক্তার সাথে আলাপ করলে জানা যাবে।

এসব সমস্যার জন্য আপনি ব্যবসায় ছেড়ে চলে যাবেন তা নয়। এই সমস্যাগুলো মাথায় রেখে ব্যবসার পরিকল্পনা করবেন।

Comments

comments

About The Author



Freelance Consultant, Writer and speaker . Jahangir Alam Shovon has been in Bangladeshi Business sector as a consultant, He has written near about 500 articles on e-commerce, tourism, folklore, social and economical development. He has finished his journey on foot from tetulia to teknaf in 46 days. Mr Shovon is social activist and trainer.

No Comments

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *