চাকুরীর সাক্ষাৎকার ও এর প্রকারভেদ

217
চাকুরীর সাক্ষাৎকার

 

চাকুরীর সাক্ষাৎকার ও এর প্রকারভেদ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

চাকুরীপ্রার্থী এবং চাকুরীদাতা উভয়ের জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণ বা প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চাকুরী প্রার্থী যেমন চাকুরী প্রত্যাশা করে সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহন করে তেমনি চাকুরী দাতাও একজন দক্ষ কর্মীর প্রত্যাশায় সাক্ষাৎকার আহবান করে থাকেন। সাক্ষাৎকার কত প্রকার কিভাবে গ্রহণ করতে হয় এটা একজন উদ্যোক্তার জন্যও প্রয়োজন। আগে আমি www.keenlayjobs.com এর ব্লগে চাকুরী প্রাথীদের বিভিন্ন বিষয়ে সাক্ষাৎকার সম্পর্কিত লেখাগুলো লিখেছিলাম। সেসব প্রবন্ধ আমার লেখা ‘‘নিজেকে গড়ে তুলত’’ বইতে পরে স্থান পেয়েছে। আজ এই লেখাটি তাই উদ্যোক্তা চাকুরীদাতা বা সাক্ষাৎকার গ্রহীতাদের জন্য নিবেদন করা হলো।

সাক্ষাৎকার বা ইন্টারভিউ কি? কেন গ্রহণ করা হয়ে থাকে? এই বিষয়ে নতুন কিছু বলার অপেক্ষা রাখেনা। সাক্ষাৎ মানে দেখা হওয়া আর সাক্ষাৎকার মানে হচ্ছে দেখা হওয়ার সাথে সাথে কথাবার্তা বলা বা প্রম্নোত্তর এর মাধ্যমে জেনে নেয়া। এটা বিভিন্নরকম হতে পারে। একজন সাংবাদিক একজন অভিনেতা কিংবা দলনেতার সাক্ষাৎকার নিতে পারেন। একজন চাকুরীদাতা একজন চাকুরীপ্রার্থীর সাক্ষাৎকার নিতে পারেন। একজন ভিসা অফিসার একজন পর্যটকের সাক্ষাৎকার নিতে পারেন। একজন ডাক্তার তার রোগীর সাক্ষাৎকার নিতে পারেন এবং ব্যাংক কর্মকর্তা তার লোন গ্রহীতার সাক্ষাৎকার নিতে পারেন।

আমরা আজ যে সাক্ষাৎকার নিয়ে আলোচনা করবো সেটা হলো একজন বা একাধিক নিয়োগকর্তা একজন বা একাধিক চাকুরীপ্রার্থী বা নিয়োজিতির সাক্ষাৎকার বিষয়ক। এ ধরনের সাক্ষাৎকার প্রধানত চার প্রকার। তবে ১৬টি ধরণ রয়েছে প্রচলিত এসব সাক্ষাৎকারের। এর বাইরেও কেউ কেউ নতুনভাবে তার কর্মী বাছাই পক্রিয়ার জন্য সাক্ষাৎকার নিতে পারেন।

Job Interview?

Job Interview? No Just Adda like talking time

ক) মুখোমুখী সাক্ষাৎকার:

সহজ কথায় সামনা সামনি মানে একজনের সম্মুখে আরেকজন বসে এ ধরনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এ ধরনের সাক্ষাৎকার একটি পদ্ধতি হলো জীবনবৃত্তান্ত বা অন্যকোনো ভাবে বা লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে তারপর সাক্ষাৎকার নেয়া।  একে Selected Interview বলা যায়।  আরেকটি পদ্ধতি হলো সরাসরি সাক্ষাৎকারের তারিখ দেয়া। এধরনের সাক্ষাৎকারকে ইংরেজীতে বলে Walk in Interview। মুখোমুখী সাক্ষাৎকার আবার বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন-

১. নির্দেশনামূলক সাক্ষাৎকার

২. অ-নির্দেশনামূলক সাক্ষাৎকার

৩. পীড়নমূলক সাক্ষাৎকার

৪. বোর্ড সাক্ষাতকার

৫. দলগত সাক্ষাৎকার

৬. ডেপথ সাক্ষাৎকার

৭. উপস্থাপনীয় সাক্ষাৎকার

৮. হোম টাস্ক সাক্ষাৎকার

৯. মনস্তাত্বিক সাক্ষাৎকার

১০. এসাইনমেন্ট সাক্ষাৎকার

১১. বব্যহারিক সাক্ষাৎকার।

১২. পোর্ট-ফোলিও ভিত্তিক সাক্ষাৎকার

১৩. ইনটার্ন সাক্ষাৎকার

খ) অনলাইন সাক্ষাৎকার: Online Interview

অনলাইনে ভিডিও কল, অডিও কল, স্কাইপে কিংবা ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে যে সাক্ষাৎকার গ্রহন করা হয় সেটাই অনলাইন সাক্ষাৎকার।

গ) লিখিত সাক্ষাৎকার: Written Interview.

অনেক সময় নিয়োগ কর্তা চাকুরী প্রার্থীকে তার সামনে বসিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন র উত্তর লিখতে বলেন। কখনো প্রশ্ন মুখে করেন কখনো কাগজে লেখা থাকতে পারে। প্রার্থীর কাছ থেকে কখনো কাগজে লিখে উত্তর নেয়া হয় আবার কখনো বোর্ডে বা কম্পিউটারে লিখতে বলা হয়। এটাই Written Interview. মনে রাখতে হবে লিখিত পরীক্ষা আর লিখিত সাক্ষাৎকার এক নয়।

ঘ) মিশ্র সাক্ষাৎকার: Multitasking Interview.

একটি সাক্ষাৎকারে যখন মুখোমুখী প্রশ্ন করা হয়, আবার কিছু লিখতে দেয়া হয়, আবার কোনো এসাইনমেন্ট দেয়া হয়, আবার সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ করে দেখাতে বলা হয় সেটাকে আমরা বলি মিশ্র সাক্ষাৎকার বা Multitasking Interview.

ঙ) দূর-সাক্ষাৎকার: Tele Interview

এধরনের সাক্ষাৎকার খুব কালে ভদ্রে দেখা যেত। বিভিন্ন রেফারেন্সে দূরের কাউকে নিয়োগ দেয়ার জন্য এ ধরনের সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন হতো। যেমন ধরি বাংলাদেশ ফুটবল কোচ নিয়োগের জন্য। তবে ভিডিও কল সুবিধা আসার পর টেলি কনফারেন্স করে সাক্ষাৎকার নেয়া একরকম বন্ধ হয়ে গেছে বলা যায়।

 

এবার আসা যাক সরাসরি সাক্ষাৎকারগুলো কেমন হয় সে বিষয়ে আলোচনায়-

১. নির্দেশনামূলক সাক্ষাৎকার: Directive Interview

এই পদ্ধতিতে প্রার্থীকে তার দক্ষতা ও জ্ঞান যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে একে একে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয়। প্রার্থী বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে।

২. অ-নির্দেশনামূলক সাক্ষাৎকার: Non-Directive Interview

এখানে প্রার্থীকে একের পর এক প্রশ্ন্ করার বদলে নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে তার কতটুকু জানা সেটা বলতে বলা হয়। অথবা তার নিজের অভিজ্ঞতার গল্প কিংবা কোম্পানীর উন্নয়নে তার ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা শোনা হয়।

৩. পীড়নমূলক সাক্ষাৎকার: Squeezing Interview

এ পর্যায়ে প্রার্থীকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করা হয় যতক্ষন না কোনো পক্ষ বুঝতে না পারছে তারা সামনে এগুবে কিনা মানে প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া যায় কিনা? এক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন করা হয়না। জটিল, কিছুটা অপ্রস্তুত হওয়ার মতো কিংবা বিরক্তিকর প্রশ্নও করা হতে পারে। করা হয় ব্যক্তিগত বিষয়েও যাতে প্রার্থীর ধৈর্য ও পরিপক্কতা পরীক্ষা করা হয়। অবশ্যই পরিপক্ক হতে হয় উভয়কে। প্রশ্ন এমন হতে হয় যাতে প্রার্থীর আত্ম-সম্মানে না লাগে। আবার প্রার্থীরও ম্যাচিউরিটি প্রয়োজন হয় যাতে তিনি প্রশ্নগুলো মেজাজ ঠিক রেখে উত্তর দিতে পারেন।

চীনে মধ্যযুগে খুব কঠিন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেয়া হতো। শুধু তাই নয় মাসের পর মাস তাদের একটি ঘরের মধ্যে থাকতে হতো। নানারকম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হতো। এবং এতে করে সরকারী চাকুরীপ্রার্থীদের কারো কারো প্রাণহানিও ঘটতো।

৪. বোর্ড সাক্ষাতকার: Board Interview

এক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য একটি বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের সদস্যগন বিভিন্ন বিষয়ে ভাগ করে প্রার্থীকে সে অনুযায়ী প্রশ্ন করে থাকেন। বিভিন্ন অডিশন, সরকারীর চাকুরী এসব ক্ষেত্রে এ ধরনের সাক্ষাৎকার বেশী প্রচলিত।

৫. দলগত সাক্ষাৎকার: Group Interview

কখনো কখনো দলগত সাক্ষাৎকারও নেয়া হয়। টিম ওয়ার্ক দক্ষতা পরীক্ষার জন্য এটা বেশী গরুত্বপূর্ণ। এতে ৬/৭ কিংবা ১০ জনের দল থাকে একজনকে দলনেতা নির্বাচন করা হয়। এসাইনমেন্ট বেজডও থাকে এ ধরনের ইন্টারভিউ গুলো।

৬. গভীর সাক্ষাৎকার: Depth Interview

এ ধরনের সাক্ষাৎকার নিয়োগকর্তা খুব ঠান্ডামাথায় নিয়ে থাকেন। কিছু কৌশলগত প্রশ্ন করে মুল বিষয়টি বুঝে নেয়ার চেষ্টা করেন।

৭. উপস্থাপনীয় সাক্ষাৎকার: Presentation Based Inerview

এই প্রক্রিয়ায় প্রার্থীকে আগেই কোনো একটা বিষয়ে প্রেজেন্টশান তৈরী করে আনতে বলা হয়। তখন চাকুরী দাতা তার প্রেজেন্টেশান শুনেন এবং দেখেন তারপর বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।

৮. হোম টাস্ক সাক্ষাৎকার: Home task Interview

এক্ষেত্রে প্রার্থীকে বাসা বা বাড়ী থেকে একটা কাজ করে আনতে বলা হয়। হতে পারে কোনো প্রেজেন্টশান কিংবা এসাইনমেন্ট হতে পারে কোনো বিজনেস পরিকল্পনা তৈরী কিংবা কোনো প্রোফাইল তৈরীর কাজ। মার্কেটিং কোম্পানীগুলো কখনো কখনো চাকুরী প্রার্থীকে তার পরিচিত ১০০/৫০ কিংবা ২০ জনের ডাটা নাম ও ফোন নাম্বার নিয়ে আসতেও বলেন কখনো কখনো। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মার্কেটিং বা উন্নয়ন পরিকল্পনাই চাওয়া হয়।

৯. মনস্তাত্বিক সাক্ষাৎকার: Psychological Interview

এটা পীড়নমুলক হতে পারে আবার নাও হতে পারে। বুদ্ধিমত্তা ও আচরণ পরীক্ষা করার জন্য এ ধরনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। আগেকার দীনে জাপানে চীনে ও জাপানে পীড়নমূলও মনস্তাতিত্ক ২ ধরনের সাক্ষাকার প্রচলিত ছিলো। এমনকি গত শতাব্দীতেও জাপানে যেসব রেলচালক তাদের ভুলের কারণে ট্রেন দূর্ঘটনায় পতিত হতো, তাদেরকে Squeezing পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেত হতো। যা ছিলো Psychological খুব পীড়াদায়ক।

১০. এসাইনমেন্ট সাক্ষাৎকার:  Assignment Based Interview

আগে বলা হয়েছে এ ধরনের সাক্ষাকারে অংশগ্রহেনের পর বলা হয় একটি বিষয়ে এসাইনমেন্ট জমা দিতে। এসাইনমেন্ট পছন্দ হলো নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়।

 

১১. ব্যহারিক সাক্ষাৎকার:  Practical Interview

সাধারণতা কারখানা বা টেকনিক্যাল কাজের ক্ষেত্রে এ ধরনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এতে যে কাজের জন্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হবে সে কাজটি করে দেখাতে বলা হয়।

 

১২: পোর্টফোলিং বেজড সাক্ষাৎকার: Portfolio Based Interview

এ ধরনের সাক্ষাৎকার টেকনিক্যাল ও সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে বেশী কার্যকর। যেমন একজন ডিজাইনারকে বলা হয় তার করা কিছু কাজের নমুনা পাঠানে তাতেই কতৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যেমন একটন কনটেন্ট রাইটারকেও তার কাজের নমুনা পাঠাতে হয়। শুধু নমুনা পাঠালে তার নাম সাক্ষাৎকার নয়। যখন নমুণা সামনে নিয়ে উভয় নানা বিষয় প্রশ্ন-উত্তর চালাবেন তখনি সেটাকে পোর্টফোলিং বেজড ইন্টারভিউ বলা হবে।

১৩: ইনটার্ণ সাক্ষাৎকার : Intern Interview

এটা প্রচলিত সাক্ষাৎকারের মধ্যে পড়েনা। এক্ষেত্রে বলা হয় প্রার্থীকে ৩ দিন বা ২ মাসের জন্য কাজ করতে হবে, সেজন্য কখনো বাতা থাকে কখনো থাকেনা। এর মধ্যে প্রার্থী নিজেকে যাচাই করতে পারলে তার চাকুরী হবে। আর নিজেচে প্রমান করতে না পারলে তাকে বিদায় নিতে হবে। এটাকে শিক্ষানবীশ সাক্ষাৎকারও বলা যেতে পারে।

এই লেখার কয়েকটি পয়েন্ট লুৎফর রহমান রচিত ‘‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও ব্যবসায় আধুনিক ব্যবস্থাপনা’’ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।

 

 

Comments

comments

About The Author



Freelance Consultant, Writer and speaker . Jahangir Alam Shovon has been in Bangladeshi Business sector as a consultant, He has written near about 500 articles on e-commerce, tourism, folklore, social and economical development. He has finished his journey on foot from tetulia to teknaf in 46 days. Mr Shovon is social activist and trainer.