করোনা ও আইটি সেক্টর

করোনা ভাইরাস ও এই সময়ের অনলাইন বাণিজ্য

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

গোটা বিশ্বে করোনা সংক্রমন কে মহামারী ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছে এবং সরকারী এজেন্সি, বেসরকারী স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তজাতিক সংস্থাগুলো নিরাপদ থাকার জন্য বিস্তারিত নির্দেশণা দিয়ে যাচ্ছে। এসব নির্দেশনার অন্যতম হলো, জনসাধারণ যেন সমাগমপূর্ণ স্থানে গমন না করে। এতদসংক্রান্ত কারণে ইতোমধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান জন্ম শতবার্ষিকীসহ বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী অনুষ্ঠানসমূহ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। সর্বশেষ আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আসলে এরচেয়ে কয়েকশগুণ বেশী মানুষ প্রতি বছর মারা যায় সড়ক দূর্ঘটনা, সামাজিক অপরাধ কিংবা অন্যান্য রোগে, যেমন হার্ট এটাক, প্রেসার ক্যান্সার, কিডনী সমস্যা এবং অন্যান্য কারণে। সেদিক থেকে এটা এখনো ভয়ানক পর্যায়ে যায়নি। তবুও ভয় ও আতংকের দুটো বড় কারণ হলো এটি খুব ছোঁয়াছে এবং বয়স্ক ও হাপানিরোগীদের ক্ষেত্রে এটির কার্যকর কোন সমাধান আবিষ্কার হয়নি। সেজন্য বিশ্বজুড়ে নানা সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বিমানের ফ্লাইট বন্ধ, জনসমাবেশ স্থগিত, স্কুল ছুটিসহ নানাবিধ সতর্কতামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়ে।

বাংলাদেশে যেহেতু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। এবং ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশংকা তৈরী হয়েছে। তাই সতর্কতামূলকভাবে ইতোমধ্যে জনসমাগমে না যেতে বলা হয়েছে। মুজিব জন্ম শতবর্ষের অনুষ্ঠানসহ সরকারী সকল গণজমায়েত বিভিন্ন মেলা স্থগিত করা হয়েছে। জনসাধারণকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘোরাফেরা না করতে, বাইরে বের হলে মুখোশ পরতে, বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করলে হাত ধুতে। পরিস্থিতি খারাপ হলে হয়তো স্কুলও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং করোনার বিস্তার ঠেকাতে আমাদের উচিত হবে সতর্কতামূলক বিধানগুলো মেনে চলা। কিন্তু আমাদের জীবন কি থেমে থাকবে। প্রতিদিন খাওয়া, বাজার করা, লেখাপড়া, জরুরী প্রয়োজনে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা এসব কিছুই থেমে থাকতে পারে না। এগুলো থেমে থাকার বিষয় নয়। তাহলে আমাদের এমন একটি উপায় বের করতে হবে, যাতে মানুষের ভীড়ের মধ্যে না গিয়েও আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান হয়। প্রযুক্তি আমাদের সে সুবিধাগুলো এনে দিয়েছে।

 

অনলাইন শপিং

আমরা যখন বাজারে যাই তখন বাজারের ভীড়ের মধ্যে মানুষগুলো সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। আর এধরনের পরিস্থিতিতেই করোনা ভাইরাস ছড়ানোর আশংকা থাকে সবচেয়ে বেশী আমরা চাইলে বাজারের এই ভীড়কে সহজেই এড়িয়ে যেতে পারি।  চাল-ডাল থেকে  কাপড়-জুতা, ফোন-কম্পিউটার থেকে ফ্রিজ-টিভি, শিশুখাদ্য কিংব শিশুপন্য, ঔষধ কিংবা নিত্যখাবার, মাছ থেকে মিষ্টি, আচার থেকে শুটকি সবই যখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। তখন আমাদের উচিত প্রযুক্তির এই আর্শিবাদকে দুহাত পেতে গ্রহণ করা। আসুন আমরা অনলাইনে কেনাকাটা করি। মানুষের ভীড় এড়িয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানোর এই সুবিধা আপনি অবশ্যই ভোগ করতে পারেন। যেকোনো অনলাইন শপ থেকে কেনাকাটা করার মাধ্যমে।

অনলাইন রেস্টুরেন্ট

রেস্টুরেন্টে এর খাবার যদি অনলাইনে অর্ডার করে মুহুর্তেই বাসায় এসে হাজির হয়, তাহলে আমাদের রেস্টুরেন্ট এর মতো পাবলিক পোলসে গিয়ে খাওয়ার প্রয়োজন পড়বেনা। চাইলে আমরা এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারি।  রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষের আনাগোনা থাকে সারাদিন। নানা জয়গা থেকে তারা আসেন আবার ফিরে যান নানা জায়গায়। বেশীরভাগ রেস্তোরা আবার শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। মানে এগুলোতে তাপমাত্রা কম থাকে। আসা যাওয়া কিংবা পাশে বসে খাওয়ার মাধ্যমে ছড়াতে পারে করোনার জীবানু। তাই একটু সচেতন হলে আমরা রেস্টুরেন্ট বাদ দিয়ে রেস্টুরেন্ট এর গরম গরম খাবার বাসায় বসেই খেতে পারি। আশংকাযুক্ত কয়টা দিন রেস্টুরেন্টে না গেলে এমন কোনো ক্ষতিই কারো হবে না। আর সেজন্য আপনি অনলাইনে অর্ডার পছন্দের রেস্টুরেন্ট এর এর খাবার পছন্দ করেন তার খাবার। আর এভাবে আমরা আরেকদফা করেনা সংক্রমণ এর আশংকা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারি।

অনলাইন এডুকেশন

না চাইতেই প্রযুক্তি আমাদের নানা সেবা দিয়ে চলেছে। চাইলে আমরা সেটো নিতেও পারি? ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বেশকিছু ওয়ার্কশপ ও সেমিনার। বন্ধ হচ্ছে পারে ট্রেনিং প্রোগ্রামসমূহ। আশংকা রয়েছে স্কুল কলেজ বন্ধ হওয়ার। কিন্তু আমরা আসলে কেউ চাইনা স্কুল কলেজ কিংবা জ্ঞান অর্জন বন্ধ থাকুক। শিক্ষা এমন এক জিনিস যা থেমে থাকলে গোটা জাতি পিছিয়ে পড়বে। তাই একে সচল রাখতে হবে। শিক্ষা সচল রাখার সুবিধা দিচ্ছে আমাদের প্রযুক্তি।  তাই আমরা চাইলে ইন্টারনেটে ঘেঁটে এই সময়ে জেনে নিতে পারি দরকারী তথ্য। ইউটিউবে দেখে শিখতে পারি দরকারী যেকোনো কিছু। এবং বিভিন্ন অনলাইন স্কুল এর সাথে যুক্ত হতে পারি সহজে।  শুধু তাই নয় অনলাইন লাইভ থেকে যুক্ত থাকতে পারি শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে।  স্কুল থেকেও ক্লাস রুমের পরিবর্তে লাইভ ক্লাস চালু করা যেতে পারে।

 

অনলাইনে স্বাস্থ্যসেবা

আজকের প্রযুক্তি একদিকে সারাপৃথিবীকে একটি গ্রামে পরিণত করার কারণে রোগব্যাধী যেমন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে। তেমনি চিকিৎসা সেবাও ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। এই করোনা আতংকের সময় আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ রেখে যেভাবে জরুরী ডাক্তারি ও ঔষধ সেবা গ্রহণ করতে পারি।

১.         মাস্ক, হ্যান্ডওয়াশ ও স্যানিটাইজার এর জন্য ফার্মাসীতে ভীড় না করে অনলাইন শপ থেকে কিনতে পারি।

২.         প্রাথমিক চিকিৎসাবক্স বাসায় কিনে রাখুন। প্রাথমিক স্বাস্থসেবা বাসায় বসে নিশ্চিত করুন।

৩.        ডাক্তার এপয়েন্টমেন্ট, ছোটখাটো পরামর্শ অনলাইন থেকে নিন।

৪.         তবে জরুরী প্রয়োজনে অবশ্যই ডাক্তার বা হাসপাতালে যান। সেক্ষেত্রে মাস্ক পরুন। সম্ভব হলে হ্যান্ড গ্লাভস পরুন। আর সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুতে ভুলবেন না।

৫.         অনলাইন ফার্মাসী থেকে ঔষধ কিনুন।

৬.        প্রেসার মাপা, জ্বর মাপা, ডায়বেটিক পরীক্ষা এসব বাসায় বসে করুন।

৭.         ইনজেকশন দেয়া, থেরাপী নেয়া এসব সেবা নিতে অন-কলে লোক ডাকুন।

 

অনলাইন লাইভ প্রোগ্রাম

কোনো অবস্থাতেই কোনো কিছু থেমে থাকা মানে পিছিয়ে যাওয়া। তাই যারা যে প্রোগ্রাম আয়োজন করার কথা ভাবছেন। বা আয়োজনের জন্য দিনক্ষণ ঠিক করেছেন। প্রোগ্রামগুলো বা তিল না করে অথবা স্থগিত না করে অনলাইনে লাইভ করুন। আপনার গ্রাহক স্রোতাদের অনলাইনে কানেক্ট করে অনলাইল লাইভে সভা, সেমিনার ওয়ার্কশপ আয়োজন করুন।

অনলাইন অফিস

আমাদের দেশে আমরা অফিসে এসে কাজকর্ম সারলেও আজকাল সবকাজেই একটি পিসি বা ল্যাপটপে করে থাকি। সেটা আবার ইন্টারনেট যুক্ত থাকে। তাই আমরা চাইলে আমাদের অফিসিয়াল কাজগুলো অনলাইন থেকে করতে পারি। ডকমেন্টস পাঠানো, অনলাইন মিটিং-কনফারেন্স ইত্যাদি সকল কাজই অনলাইনে সম্ভব। আমাদের ভাল থাকার জন্য সে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার সে সিদ্ধান্তই নিতে হবে। আর এজন্য প্রযুক্তি যেহেতু আমাদের পাশে রয়েছে তাই সমস্যা থাকার কথা নয়।

 

অনলাইনে সরকারী সেবা

প্রতিনিয়ত আমাদের নানাধরনের সরকারী সেবা নিতে হয়। আবার সেসবের জন্য ফরম পূরণ, বিল দেয়া নানাবিধ কাজে সরকারী অফিস যেমন বিদ্যুৎ অফিস, সিটি কর্পোরেশন, থানা, পোস্ট অফিস এসবে ভিড় করতে হয়। কিন্তু আমরা চাইলে এসব সেবা অনলাইন ভিত্তিক করার মাধ্যমে ভীড় এড়িয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারি। যেমন-

১.         ডকমেন্টস জাতীয় পার্সেল স্ক্যান করে বা লিখে অনলাইনে প্রেরণ করতে পারি।

২.         গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎবিল অনলাইনে প্রদান করতে পারি।

৩.        ট্রেড লাইসেন্স, জন্মনিব্ধন, থানায় জিডি করা এগুলো অনলাইনের মাধ্যমে করতে পারি।

 

অনলাইন ফিন্যান্স

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো অনলাইন ভিত্কি সেবা দিয়ে এবং মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে আমাদের জন্য কাজটা সহজ হয়ে গেছে। আরো সহজ হে গেছে ডেবিট ও কেডিট কার্ড এর মাধ্যমে অনলাইনে পন্যক্রয়ে মূল পরিশোধ প্রক্রিয়ার কারণে। আমরা চাইলে ব্যাংকে না গিয়ে এসব লেনদেন সম্পন্ন করতে পারি। তাই করোনা সংক্রান্ত আশংকা থাকাকালীন আমাদের কাজ হবে। করোনা ঠেকানোর জন্য অনলাইনে আর্থিক লেনদেন করা বা স্বশরীরে না গিয়ে আর্থিক লেনদেন করা।

 

275 total views, 8 views today

Comments

comments