razarbazar service

করোনার প্রথম ধাক্কা ও ই-কমার্স

-জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

সাধারণ ছুটি বা গণচলাচল সংকচিত হলে কি হবে? এটা নিয়ে অনেকের মধ্যেই দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিক সময়ে সরকারের পদক্ষেপ এর কথা ঘোষণা দিয়ে সবাইকে সে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

 

বিশেষ করে অনলাইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের প্রয়োজনে সেবা দিয়েছে এটা সত্যি একটা মাইল ফলক রচনা করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা তৈরী হলে সেজন্য আমাদের একটা ভরসার জায়গা তৈরী হয়েছে ই-কমার্সের মাধ্যমে।

 

দেখা গেছে আগে কখনো যারা অনলাইন থেকে কেনাকাটা করেননি। তারা ই-কমার্সে অর্ডার দিয়ে নিত্য প্রয়োজণীয় দ্রব্য চাল, ডাল, তেল, লবণ এসব কিনেছেন। অনলাইনে এগুলো পাওয়া গেছে বলে কেউ ক্রেতাদেরকে জিম্মি করতে পারেনি এবং সরকারও এ ব্যাপারে সবসময় সজাগ ছিল। বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি পর্যায়ে নজর রাখা হয়েছে এবং যেখানে যে ধরনের সহযোগিতা দেয়া দরকার তা দেয়া হয়েছে।

 

ই-কমার্স যে হারে প্রবৃদ্ধি লাভ করছে। এতে করে আগামী বছর নাগাদ এই সেক্টরে প্রায় ৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরীর উজ্জল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মার্কেটপ্লেস, লজিস্টিক সেবাদাতা, ফুড ডেলিভারী, বাইক রাইডিং মিলিয়ে প্রতিনিয়ত এখাতে তরুনরা যুক্ত হচ্ছে উদ্যোক্তা হিসেবে এবং কর্মী হিসেবে। এখাতে সৃজনশীল এবং উদ্যমী তরুনরা তাদের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে পারবে বলে আমি মনে করি। আমাদের যে বিশাল তরুন জনশক্তি রয়েছে তাদেরকে কাজে লাগানোর মোক্ষম জায়গা হতে পারে এই ই-কমার্স সেক্টর।

 

ই-কমার্সের ভবিষ্যত সম্ভাবনা নিয়ে এখন আর কোনো কনফিউশন নেই। বিশেষ করে জরুরী ও দূর্যোগ সময়ে অনলাইন ব্যবসা কতটা জরুরী তা আমরা বুঝতে পেরেছি।  করোনা সংক্রমনের ভয়ে যখন নগরবাসী নিজগৃহে অবস্থান করেছিলেন। তখন তাদের কাছে জরুরী পণ্যসেবা পৌছে দেয়া অত্যন্ত দরকারী কাজ ছিল। সে কাজটাই করেছে ই-কমার্স কোম্পানীগুলো। এটা ইতিবাচক ও সময় উপযোগী উদ্যোগ ।

আরেকটা সেক্টর হলো ক্রস বর্ডার ই-কমার্স। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র কুটির কিংবা শাড়ী পাঞ্জাবী এসবের চাহিদা আছে দেশের বাইরে। অনেক প্রবাসীরা এগুলো অনলাইনে ক্রয় করেন। ই-কমার্সের কারণে তাদের জন্য এসব পছন্দমত পণ্য কেনা আরো সহজ হয়ে গেছে। দিন দিন ক্রস বর্ডার প্রসারিত হচ্ছে। আমাদের সবার উচিত বৈদেশিক মূদ্রা আনয়নকারী এই খাতকে সব ধরনের সহযোগিতা করা।

ঘণবসতিপূর্ণ আমাদের দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, স্মার্টফোনের ব্যবহার এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। তাই ই-বাণিজ্যের প্রসারও দ্রুত ঘটছে। তাই দেশের ১৬ কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ করতে হলে যারা প্রচলিত প্রন্থায় ব্যবসা করছেন তারাও এই সেক্টরে আসতে পারেন। জনবল, লজিস্টিক এবং কারিগরি সহযোগিতার ব্যাপারে ই-ক্যাব সহযোগিতা করবে বলে আমাকে জানিয়েছে।

যারা জনসাধারণের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসাকে প্রাধান্য না দিয়ে এই মুহুর্তে সেবা দিচ্ছেন। তাদের এই মানসিকতা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। আমি অনুরোধ করবো তারা যেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ই-ক্যাবের দেয়া নিরাপত্তা নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করেন। এতে তারা নিজেরাও নিরাপদ থাকবেন এবং ক্রেতারাও নিরাপদ থাকবে।

করোনা সংক্রমণ সমস্যায় নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের প্রসার হলেও প্রথমদিকে ই-ক্যাবের ৯২ ভাগ উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়েছিল। ই-ক্যাবের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কর্মী কাজ করছে। যাদের ২৬ শতাংশ নারী। ই-ক্যাবের ১১০০ সদস্য প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকার বিশাল ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। শুধুমাত্র অফিসভাড়া এবং কর্মীর বেতন বাবদ মাসিক খরচের চাপ রয়েছে ৪৮০ কোটি টাকা। আমরা সরকারের কাছে ক্ষয়ক্ষতির ৫০% দাবী করেছি মাত্র। এই হিসেব একটি জরিপের মাধ্যমে আমরা নির্ণয় করেছি।

সাধারণ ছুটি ঘোষনার আগে বহু উদ্যোক্তা পহেলা বৈশাখ ও ঈদকে সামনে রেখে পোশাকসহ বিভিন্ন পন্যের মজুদ করেছিলেন। প্রায় ৫৪ ভাগ উদ্যোক্তার স্টক ওয়ারহাউসে পড়ে আছে। অনেকে আবার দারদেনা করে এসব পণ্য কিনেছেন বিক্রয় করে শোধ করবেন বলে। তাদের চাপটা আরো বেশী। সেজন্য আমরা বার বার বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ে দ্বারস্থ হয়েছি। এবং বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ও সহযোগী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

ক্রস বর্ডার ই-কমার্স থেকে যে ১০০ কোটি টাকা বৈদিশক মুদ্রা অর্জিত হতো তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। পর্যবেক্ষণে আমরা দেখা যায় গত কয়েক বছরের হিসেবে এই খাত ৭৪% হারে বিকশিত হচ্ছে। মানে দেশীয় পন্যের বাজার ক্রমশ অনলাইনে প্রসারিসত হচ্ছে। তাই এই খাতকে  গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

কয়েকটি সেক্টর ১০০ ভাগ বন্ধ রয়েছে। যেমন- ই-ট্যুরিজম। বিশেষ করে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অনলাইন পেমেন্টে ৯০ ভাগ লেনদেন কমে গেছে।

রেস্তোরার খাবারের ক্ষেত্রে দেখা যায় অন্যান্য সময় নামীদামী রেস্টুরেন্টগুলোর ৭০ ভাগ ক্রেতা আসে ফুড ডেলিভারী সার্ভিস থেকে। কিন্তু রমযানে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯০ ভাগ অর্ডার হয় অনলাইন থেকে। রমযানে ইফতার ও সেহরীর জন্য যেসব ক্রেতা ফুড ডেলিভারী সেবা নেন তাদের কথাও আমাদের মাথায় রেখে কাজ করতে হয়েছে।

একদিকে যেমন উদ্যোক্তাদের কথা ভাবতে হচ্ছে। আরেক দিকে জনসাধারণের কথাও ভাবতে হয়েছে। কারণ সাধারণ ছুটি দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেকের জরুরী পন্যের তালিকা বড় হচ্ছে। আরেকটা বিষয় হলো রমযান মাস কারো ওয়াশিং মেশিন, কারো ফ্রিজ, কারো হাসপাতালের জন্য কম্পিউটার এক্সেসরিজ দরকার হচ্ছিল। এসব বিষয় দফায় দফায় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সাথে যোগাযোগ করে সমাধান করতে হয়েছে। এমনও হয়েছে রাতের ১২টায় সবজির ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করতে পারছেনা। তখনো আমরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলে এগুলো সলভ করেছি। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন ছিল।

এসব ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় সরকারের কাছে ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে ২৪০ কোটি টাকা আর্থিক সাহায্য এবং ৬শ কোটি টাকা সহজ শর্তে ঋণ চাওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ই-কমার্স সেক্টরের বর্তমান ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দ্বিগুন হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে  কোনো ছাড় দেয়া হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, ডাক বিভাগ, আইসিটি মন্ত্রণালয়, সকল জেলা প্রশাসন, ডিএমপি এবং বিভিন্ন এসপি অফিস এ ব্যাপারে ই-ক্যাবকে সহযোগিতা করেছে।

 

ই-ক্যাবের ১২শ উদ্যোক্তা সদস্য

  • ই-কমার্সের বাজার বাংলাদেশে ১২ হাজার কোটি টাকা।
  • গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যাণ অনুযায়ী এই খাতের ব্যবসারে প্রবৃদ্ধি ২৫%|
  • ই-কমার্স খাতে গত বছর বৈদেশিক রপ্তানী আয় ১০০ কোটি টাকা।
  • ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের ক্ষেত্রে এর প্রবৃদ্ধি ৭৪ শতাংশ
  • এক লক্ষ পঁচিশ হাজার কর্মী এই সেক্টরে কাজ করেন যার ২৬ শতাংশ নারী এবং ৭৪ শতাংশ পরুষ
  • বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এখাতের অবদান দশমিক ২ শতাংশ
  • বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৮০ হাজার পরিবার প্রতিদিন ই-কমার্স শপ থেকে সেবা পেয়ে থাকে
  • করোনা ভাইরাসের জন্য ই-কমার্স খাতে ক্ষতি মাসিক ৬৬৬ কোটি টাকা।
  • বর্তমানে ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান করোনা ভাইরাসে সময় সেবা প্রদান করছে।
  • ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে

 

79 total views, 4 views today

Comments

comments