করোনায় ই-কমার্স সেবা

করোনাকালীন সময় বা কোভিড ১৯ সময়ে ই-ক্যাবের কার্যক্রম

গত কয়েকদিন ধরে করোনা সংকটে জাতি এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে শুরু থেকে সচেতন থেকে আমাদের সদস্য প্রতিষ্ঠান এবং জনগনের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ই-ক্যাব। বলতে পারেন যখন যেখানে যা করা দরকার তাই করার চেষ্টা করেছি।

 

ই-ক্যাব এটুআই, ক্যাবিনেট ডিভিশন, আইসিটি ডিভিশন ও একশপের সাথে যৌথভাবে একটি জরুরী স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। যাতে ই-কমার্স কোম্পানীসমূহের ওয়ার হাউজ, ডেলিভারী কর্মী ও সরবরাহকৃত মালামাল কিভাবে জীবানূমুক্ত রেখে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় সে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। করোনা সংক্রান্ত বিষয়ে ই-ক্যাব সদস্য প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মীদের ভয় দূর করতে একটি বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা হেল্প লাইন চালু করা হয়। যার মাধ্যমে কয়েকজন ডাক্তার স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যেসব কোম্পানী সেবা চালু রেখেছে তাদের জন্য নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ এর ব্যবস্থা করা হয়।

 

ই-ক্যাবের মেম্বার প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ঘরে বসে তাদের নবায়ন ফি দিতে পারে এবং ই-ক্যাব অফিসে না এসেই ই-ক্যাবের মেম্বার হওয়া যায়। সেজন্য ই-ক্যাবের রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। অনলাইনে আবেদন এবং অনলাইনে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সাবমিট করে মেম্বার হওয়া যায়। এ যাবত ৪শটি কোম্পানি ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অনলাইনে আবেদন করে ই-ক্যাবের সদস্য হয়েছে। শুরুতেই ই-ক্যাবের কর্মীদের বাসায় বসে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয় এবং সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাম্ভাব্যক্ষেত্রে তাদের কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

 

জরুরী নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের সরবরাহ সচল রাখতে গত ২৫ মার্চ ই-ক্যাব ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের অনুমতি গ্রহণ করে। ই-ক্যাব সদস্যদের মধ্যে যারা নিত্যপণ্য ও ঔষধ বিক্রয় ও বিতরণ করে তাদেরকে প্রত্যয়নপত্র ও ‘‘জরুরী পণ্য পরিবহন’’ লিখা স্টিকার প্রদান করে। এছাড়া যেসব স্থানে মালামাল পরিবহন এর ক্ষেত্রে বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছেন। ই-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারী এবং অন্যান্যরা সরাসরি সেসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কাজ করেছেন। সদস্য প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার পরিবহন ও ডেলিভারী কর্মীরা কাজ করার সুযোগ পায়।

 

সাধারণ ছুটি ঘোষণা হওয়ার পর ই-ক্যাবের প্রায় ৯০ ভাগ প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশাল ক্ষতির মধ্যে পড়ে যায় কোম্পানীগুলো। এর প্রেক্ষিতে ই-ক্যাব একটি জরিপ পরিচালনা করে। যাতে এ খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়। জরিপকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য বিশ্লেষণ করে মোট ক্ষয়ক্ষতির মধ্য থেকে শুধুমাত্র কর্মচারীর বেতন ও অফিস ভাড়ার একটা অংশ সহায়তা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়। ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে করোনা পরিস্থিতিতে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষয়ক্ষতি, ই-ক্যাবের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ডিজিটাল অর্থবাজারের সার্বিক অবস্থা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়।

 

এই দূর্যোগপূর্ণ সময়ে ই-ক্যাবের কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠান যেন জরুরী নিত্যপণ্যের অহেতুক দাম বৃদ্ধি না করে তা তদারকের জন্য একটি কমিটিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতির বিবেচনায়, ইতোমধ্যে একটি কমপ্লেইন সেন্টার খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যাতে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ কোনো প্রতারণার আশ্রয় নিতে না পারে।

সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ই-ক্যাব মানবসেবা নামে একটি বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ই-ক্যাব সদস্য ও অন্যদের অনুদান দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। হাজারো পরিবারকে জরুরী খাদ্য ও অর্থ সহযোগিতা করা হয়েছে।

 

রমযানে ইফতার, ডিনার ও সেহরীর খাবারের জন্য রেস্টুরেন্ট এবং অনলাইন ফুড ডেলিভারী কোম্পানীর সেবার উপর নির্ভর করতেন রেস্তোরাসমূহ বন্ধ থাকায় তাদের খাবার জন্য সমস্যা হয়ে পড়েছিল। ফুড ডেলিভারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আলোচনা করে এবং নিরাপত্তার বিধিমালা সংযুক্ত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদনের মাধ্যমে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে খাদ্য সরবরাহের অনুমতি গ্রহণ করে ই-ক্যাব।

 

সাধারণ ছুটি বিলম্বিত হওয়ার কারণে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিভিন্ন বাসায় ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন এসব নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল ফলে রমযান মাসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির মুখে পড়ে। এছাড়া বিভিন্ন অফিসের কর্মীরা বাসায় বসে কাজ করছিল বলে বাড়তি ল্যাপটপের প্রয়োজন দেখা দেয়। এসব বিবেচনায় ই-ক্যাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আবেদন এবং যোগাযোগের মাধ্যমে এসব পণ্য অনলাইনে বিক্রির অনুমতি গ্রহণ করে। পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন এবং আমাদের কাছে আসা কিছু লিখিত ও মৌখিক অনুরোধ ছিল যে, গৃহে থাকা জনসাধারণকে মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি দিতে বইপড়া দরকার। তাই অনলাইন শপ থেকে বইকেনার সুযোগ দেয়া হোক। তার প্রেক্ষিতে ই-ক্যাব অনলাইনে বই বিক্রয় ও ডেলিভারীর অনুমতি গ্রহণ করে।

 

ই-ক্যাবের জরিপে দেখা যায় ৫২ শতাংশ ই-কমার্স উদ্যোক্তার পহেলা বৈশাখ ও ঈদের পোষাকের মজুদ পড়ে আছে। একদিকে তারা পাওনাদারের অর্থশোধ করতে পারছেন না। অন্যদিকে অনেক পোশাক নষ্ট হওয়ার আশংকা তৈরী হয়েছে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঈদকে সামনে রেখে পোশাক বিক্রির সুযোগ করে দিতে অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য অনুমতি নিতে সক্ষম হয় ই-ক্যাব।

 

ঢাকায় লকডাউন শুরু হলে নগরবাসীতে সেবা দেয়ার জন্য সক্ষমতার ভিত্তিতে ৭০টি প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়। দুটি এলাকায় লক্ষাধিক মানুষকে ২৮ দিন ও ২১ দিন নিত্যপণ্য সেবা দেয় ২০টির মতো ই-ক্যাব সদস্য প্রতিষ্ঠান। এই সেবা ছিল ন্যায্যমূল্যে এবং সাশ্রয়ীমূল্যে মানসম্পন্ন পণ্য সেবা। ওয়ারীতে দরিদ্র পরিবারকে ত্রাণও দেয়া হয় ই-ক্যাব ও মানবসেবার পক্ষ থেকে। ই-ক্যাবের এই উদ্যোগ সকলের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।

 

মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় পবিত্র উৎসব ঈদ-উল-আযহার উপলক্ষ্যে প্রতিবছর কোরবানির হাট আয়োজিত হলেও এবার গণজমায়েত এ করোনা সংক্রমনের আশঙ্কা থাকায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ই-ক্যাবের যৌথ উদ্যোগে “ডিজিটাল হাট” এর মাধ্যমে শতাধিক ই-কমার্স সাড়ে ৮ হাজার এবং দেশজুড়ে অনলাইনে প্রায় ২৭ হাজার পশু বিক্রির পাশাপাশি প্রথমবারের মত সিটি কর্পোরেশন নির্ধারিত স্থানে কোরবানি এবং মাংস প্রসেসিং এর মাধ্যমে নিরাপদ প্যাকেজিং এ হোম ডেলিভারি করা হয়।  দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে এই উদ্যোগ। বাংলাদেশ ডেইরী ফার্ম এসোসিয়েশন এর সহযোগিতায় সাড়ে চারশ পশু ঈদের ২ দিনে জবাই করে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হয়। সরকারের ৪ জন মন্ত্রী ও মেয়র এই অনলাইন হাট থেকে কোরবানি গরু ক্রয় করে এই উদ্যোগকে একটি অনন্য উচ্চতা দিয়েছেন। বর্তমানে এই উদ্যোগের খবর দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।

 

প্রাইম ব্যাংকের সাথে আলোচনা করে ই ক্যাব  ইতোমধ্যে ৫ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত দশটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করা হয়। ইতিমধ্যে সিটি ব্যাংক ও ব্রাকের প্রত্যাশা প্রকল্পকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে। আরো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে ঋণ ও বিনিয়োগ সংস্থানের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

 

পেয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সেপ্টেম্বরে ই-ক্যাবের সহযোগিতা চায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মাত্র ৩৬ টাকায় টিসিবি’র পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হলে রাতারাতি বাজারে পেয়াজের দাম কমতে শুরু করে। বাজারের ৯০ টাকা দামের পেয়াজ ৭০ টাকায় চলে আসে। বর্তমানে ১৭টি অনলাইন গ্রোসারী শপ থেকে পেয়াজ বিক্রি হচ্ছে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে মাত্র ২৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই পেয়াজ।

 

বেশকিছু সেমিনার ও ওয়েবিনার যৌথ ও এককভাবে আয়োজন করেছে ই-ক্যাব। এরমধ্যে রয়েছে রবির সাথে যৌথ সেমিনার, ভ্যাট বিষয়ক সেমিনার, পেঅনএয়ার ও অ্যামাজন এর সাথে যৌথ ওয়েবিনার ইত্যাদি। অনলাইনে প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপে করোনাকালীন সময়ে হাজার খানেক উদ্যোক্তা উপকৃত হয়েছেন। এ যাবত ই-ক্যাবের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন ৫ হাজার প্রশিক্ষনার্থী।

 

গত নভেম্বরে ই-ক্যাবের ৬ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে ইক্যাবের পক্ষ থেকে ইকমা এ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। করোনাকালীন সময়ে ফ্রন্ট লাইনে থেকে সেবা প্রদান করায় ১২ জন অগ্রনী ব্যক্তিত্ব, ১০০টি সেবাদাত প্রতিষ্ঠান ও ৩৫ জন স্বেচ্চাসেবককে এই পুরষ্কার প্রদান করা হয়। এই অনুষ্ঠানে যাত্রা শুরু করে স্কুল শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশের কার্যক্রম ই-জিনিয়াস।

 

মার্চ মাস থেকেই ঘরে থাকা জনসাধারণের দোরগোড়ায় ই-ক্যাব সদস্য প্রতিষ্টান প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা মূল্যের নিত্যপণ্য সরবরাহ করেছে। সার্বিক অর্থনীতিতে ৬ হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। তৈরী হয়েছে ৬০ লাখ উপকারভোগী। বর্তমানে প্রতিদিন ১ লাখেরও বেশী ডেলিভারীর মাধ্যমে সেযব মানুষ ডিজিটাল কমার্সের উপর আস্থা রেখেছে। তাদেরকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

 

517 total views, 24 views today

Comments

comments