কথার কথা নয়, কাজের কথা

106

 কথার কথা নয় কাজের কথা

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

লেখাপড়া এবং শিক্ষা দুটো কি একই জিনিস? আমার কাছে অন্তত দুটোর ভিন্ন অর্থ রয়েছে। আমরা মূলত লেখাপড়া বলতে প্রথাগত শিক্ষাকে বুঝি যা আমরা বিদ্যালয় থেকে গ্রহণ করি। আজকাল প্রাইভেট টিউশন থেকেও পাই। পেয়ে থাকি পাঠ্য পুস্তক থেকেও। পাঠ্যপুস্তকের লেখাপড়া আমরা শুরু করি অ আ ক খ দিয়ে। যা শেষ আর কখনো হয়নো। সেই ২৬, ২৯ কিংবা ৫০টি অক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি বিদ্যালয়ের শেষ দিন পর্যন্ত বা তার পরেও।

এইযে অক্ষরজ্ঞান, এটাকে আমরা লেখাপড়া বলছি। এই অক্ষরতো আদতে কোনো জ্ঞান নয়। এটা জ্ঞান ধারণ, সংরক্ষণ কিংবা বিনিময়ের মাধ্যম বটে। এই অক্ষরের মাধ্যমে আমরা তথ্য সংরক্ষণ করছি, চিন্তার বিনিময় করছি, ইতিহাস ধরে রাখছি এবং সেটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হাত বদল করছি। প্রাথমিকভাবে এই পড়ােেলখার দুটো রুপ আমরা পেলাম। প্রথম এটা হলো অক্ষরজ্ঞান দ্বিতীয়ত তথ্য, চিন্তা বা ইতিহাস।

আগেই বলেছি সরাসরি অক্ষরজ্ঞান আমাদের কাজে লাগেনা। যখনি জ্ঞানের বাহন কিংবা প্রতিরুপ হয় তখনি জ্ঞানকে অক্ষরের মাধ্যমে প্রকাশ করি। তাহলে তথ্য ইতিহাস কিংবা চিন্তা সেটা কি কোনো কাজে লাগে? প্রত্যক্ষভাবে নয়, কারণ এর দ্বারা আপনি আমরা সরাসরি কোনো উপকার পাইনা। পরোক্ষভাবে এগুলো আমাদের জীবনের অংশ। লেখাপড়ার যে অংশ কাজে লাগে সেটাকে আমরা পড়াশোনা বলি। একেবারে পাঠ্য পুস্তকের বাইরে তা রয়েছে। যেমন দৈনিক কোনো তথ্য, অফিসের কাজ, খবরের কাগজ, গবেষণা কিংবা জীবনমুখী কোনো বিষয়। যেমন এই বইটি। ভালো ফল বা বেশী ক্লাস পড়া লোককে বলি ‘‘লোকটার লেখাপড়া আছে’’ আবার যারা পরীক্ষাপাসের বাইরে কোনো বিদ্যায় আগ্রহী নয়। লোকে বলে ‘লোকটার পড়াশোনা নেই’। এই শব্দচয়ন কিতাবীধারা থেকে আসা নয় বরং মৌখিক প্রচলন তাই এমন বিশেষন সব সময় একরকম নাও হতে পারে।
তাহলে শিক্ষা কি? শিক্ষাই হচ্ছে আমাদের একান্ত মৌলিক ও প্রয়োজনীয় জিনিস। যেমন একজন কৃষক তিনি চাষাবাদের আদ্যপ্রান্ত সব জানেন, একজন শ্রমিক তার নিজের কাজটা বোঝেন, একজন কামার লোহা সম্পর্কে অনেক জ্ঞান রাখেন, একজন তাঁতী কাপড়বোনার কত কিছুইনা জানেন। এটাই হলো শিক্ষা। এই শিক্ষা কদাচিতই পাঠ্যপুস্তক কিংবা বইয়ের পাতায় থাকে। আর যা থাকে তা ওই কৃষকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লিখা হয়েছে। লিখা জ্ঞান দিয়ে এর জ্ঞানের পূর্নতা এখানে পায়না। যতক্ষন না তা বাস্তবতা থেকে না আসে।

তাহলে লেখাপড়া হলো আনুষ্ঠানিক অক্ষরজ্ঞান, প্রচলিত অর্থে পড়াশোনা হলো যাবতীয় আক্ষরিক জ্ঞান, আর শিক্ষা হলো যা জীবন থেকে নেয়া হয়। প্রশ্ন হলো, শুধুমাত্র অক্ষরজ্ঞান নেই বলে একজন কৃষক কিংবা শ্রমিককে কিংবা একজন রিক্সাওয়ালাকে আমরা অশিক্ষিত বলছি কেন? তিনিতো একজন শিক্ষিত লোক এবং তার কাজটা তিনি বেশভালোভাবে শিখেছেন এবং সেটা তিনি দক্ষতার সহিত সম্পন্ন করতে পারেন। তাহলে তাকে অক্ষরজ্ঞানহীন না বলে আমরা অশিক্ষিত বলছি? এটাকি তার প্রতি অন্যায় নয়?

বিষয়টা দাড়ালো যিনি চাষ করেন, যিনি রান্না করেন, যিনি সন্তান লালন করেন, যিনি ঘর বানান তিনিতো সেকাজে শিক্ষিত। আর বাদবাকী একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত লোকেরা কিছু অক্ষর তৈরী করে সেই কৃষক যিনি রোপন কাজে শিক্ষিত, সে জেলে যিনি মাছ ধরার পারঙ্গম, যে মাঝি যিনি নৌকা চালনায় দক্ষ তাকে আমরা অশিক্ষিত বলছি। আসলে কি তিনি অশিক্ষিত?
এবার আসি আমরা যাদের শিক্ষিত বলছি, তারা কারা? তারা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত ডিগ্রিধারী, তারা হয়তো প্রচলিত ভাষায় বিএপাস, মেট্রিকপাস, সেভেন পাস বা ফাইভ পাস। এদেরকে আমরা শিক্ষিত বলে লিখিত সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি। যদিও বাস্তবতা হলো এই শিক্ষা থেকে তারা জীবনের জন্য কিছুই শিখছেন না। না তারা এই শিক্ষা দিয়ে বীজ বপন করতে পারেন, না তারা কুমোরের মতো মাটির পাতিল বানাতে পারেন, না তারা একজন পল্লী বধুর মতো নকশীরুমাল কিংবা শীতলপাটি বানাতে পারেন। মানে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তারা এই শিক্ষায় পান না। মানে এটা জীবন মুখী শিক্ষা নয়। যদি তারা মূল্যবোধ শিখেন তাহলে অন্তত একটা কাজে লাগে। যদি তারা হার্ড বা সফট স্কিল, জীবন ধারা কিংবা মূল্যবোধ, কৌশল কিংবা প্রকৌশল কোনোটাই না শেখেন তাহলে এটা কেবল অক্ষরজ্ঞান এবং কোনভাবেই পরিপূর্ণ শিক্ষা নয়। অবশ্য কেউ কেউ আলাদা হয়ে থাকেন যারা পাঠক্রম বা সিলেবাইসের বাইরে থেকেও কিছু শিখে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে জানেন।

আবার কেউ যদি জীবনমূখী শিক্ষা বা ভোকেশনাল এডুকেশন সঠিকভাবে হাতে কলমে গ্রহণ করেন সেক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। তাহলে কি অক্ষরজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই। অবশ্যই আছে। কিন্তু বাস্তবমুখী শিক্ষাকে বাদ দিয়ে শুধু অক্ষরজ্ঞান শিক্ষাকে বিদ্যা বলে চালিয়ে দিয়ে আমরা ঠিক কি বোঝাতে চাই?
একসময় রাজ-রাজড়ারা তাদের ইতিহাস লিখে রাখতেন কখনোবা তাদের ফরমান

পাঠানো হতো অন্য রাজা কিংবা অধীস্থদের কাছে। এজন্য যেমন লিপিবিদ্যার প্রয়োজন হতো তেমনি প্রয়োজন হতো লিপিকারের। এভাবে চাকুরীজীবি একটা শ্রেনীর উদ্ভব হয়। যারা লিপিকার বা কেরানী। ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত তাদের চরম চাহিদা ছিলো। তাই শিক্ষা ব্যবস্থা ব্রিটিশ আমলে এমনভাবে গড়ে উঠেছে। যাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সে ধরনের কিছু কর্মী বেরিয়ে আসে।

বাস্তবতা হলো এ ধরনের কর্মীর প্রয়োজন এখন ফুরিয়ে গেছে। এই শতাদ্বীতে এদের কোনো কাজ নেই। তাই বলে কাজগুলো কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি। কাজগুলো করছে হুকুমপালনকারী কর্মচারীরা নয় বরং অধিকারিক কর্তারা এবং সেটা দায়িত্ব নিয়ে। বর্তমানে প্রাইভেট অফিসে কম্পিউটার অপারেটর বলে কোনো পোস্ট নেই। এটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অফিসে লেখার কাজ তিনি করে থাকেন যিনি যা লিখেন। এর জন্য আলাদা লোক নেই। যেসব লোক অফিসে রয়েছে। ব্যবস্থাপনা, বিপনন, মানব সম্পদ, গণযোগাযোগ, সরবরাহ শেকল প্রতিটি ক্ষেত্রে মুলত থাকে একজন অফিস বা বিজনেস লিডার আর তার অধীনে কিছু দায়িত্ববান কর্মী। যাদেরকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হয় যে কাজটি তারা করেন সে কাজটি তাদেরকে ভালোভাবে জানতে হয়। প্রয়োজনে কাজের তথ্য সমূহ দলিল সংরক্ষণ এর জন্য লিখে রাখতে হয়। কাজটা তাদেরকে জানতে হয় আর লিখে রাখার কাজের জন্য অক্ষরজ্ঞানটা তাদের প্রয়োজন পড়ে। তাহলে মুলত আমাকে কাজটা জানতে হবে। সেটা ঠিকমতো করছি কিনা তা প্রমাণ করার জন্য লিখে রাখতে হবে আর সেজন্যই অক্ষরজ্ঞান প্রয়োজন।

আমরা যারা প্রচলিত স্কুল মাদ্রাসা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি, এই শিক্ষা থেকে আমরা অক্ষরজ্ঞান পাই ঠিকই। কিন্তু এই শিক্ষা থেকে কি আমরা কিছু শিক্ষা পাই বা শিখতে পারি? সেটা হতে পারে দপ্তরে নেতৃত্ব দেয়া, হতে পারে ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, হিসাবরক্ষণ, বিক্রয়, পরিবহন কিংবা অন্যকোনো কাজ। এগুলো ভোকেশনাল শিক্ষার বাইরে। সাধারণত আমরা যদি তথ্যপ্রযুক্তি কাজ, চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশল, হিসাব বিদ্যার মতো এমন কোনো পেশাগত ও টেকনিক্যাল কাজে দক্ষ না হই, আমরা যদি ডাক্তার, আইনজীবি বা সাংবাদিক এমনকোনো স্বাধীন ও কুশলী পেশাজীবি না হই। তাহলে আমাদের সত্যি একটা কাজ জানা চাই। তা না হলে আসলে আমার করার মতো কিছুই থাকবেনা সেটা অফিস কিংবা বাড়ীতে।
অনেকে ইংরেজী জানা, কম্পিউটার অপারেট করতে জানা, তৃতীয় ভাষা জানা, ইন্টারনেটে দক্ষতা এসবকে কাজ জানা বলেন। বস্তুতপক্ষে এগুলোও কাজ বা জ্ঞানের শাখা নয়। এগুলো কাজ করা এবং জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম মাত্র। মূল কাজ না জানলে এগুলো আপনি কোনো কাজে লাগাতে পারবেন না। টাইপ না জানলে আপনি কম্পোজ করতে পারবেন না। আপনি একাউন্ট সম্পর্কে ধারণা না রাখলে কমপিউটারে হিসাব সংরক্ষণ করতে পারবেন না। আপনি ভালো বক্তা না হলে ভালো ইংরেজী জানলেও সেটা প্রকাশ করতে পারবেন না।

তাহলে বিষয়টা দাঁড়ালো এমন যে, আপনি যদি নেতৃত্ব দিতে জানেন বা দায়িত্ব নিতে জানেন তাহলে ভাষা বা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন আপনার কাজে। আপনি যদি টিম ম্যানেজমেন্ট ভালো বোঝেন তাহলে হয়তো অর্জিত জ্ঞান বা হাতের কাছে থাকা টুলকে আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি মূল কাজটা না জানেন তাহলে বাড়তি যোগ্যতাগুলো আপনি হয়তো ব্যবহারই করতে পারবেন না। যেমন আপনার মধ্যে যদি সৃজণশীলতা না থাকে তাহলে আপনি গ্রাফিকস এর কাজ জেনেও সুন্দর একটি ডিজাইন তৈরী করতে পারবেন না।

এই উপলব্দিগুলো এখনো আমাদের সমাজে আসেনি। আমাদের ধারণা আমরা পাস করে বের হবো। আর একটা চাকরি করবো। কি চাকরি করবো? নিয়োগকর্তা আমাকে কেন নেবে? কেন মাস শেষে বেতন দেবে? এই বিষয়গুলো মোটেই ভাবি না।এমনকি কে কোন সেক্টরে চাকরি করব সেটাও ঠিক করা নেই। বেশীরভাগ সময় বলিযে যেকোনো একটা চাকরি হলে হবে। এর মানে কিন্তু নেতিবাচক। কারণ একথা শোনার পর নিয়োগ কর্তা বুঝতে পারেন প্রার্থীর জীবনের লক্ষ্য ঠিক নেই এবং প্রার্থী কাজ পাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। যদি প্রস্তুত হতো তাহলে তিনি নিশ্চই একটা নির্দিষ্ট কাজ ভালোভাবে জেনে নিতেন এবং তিনি যে কাজটি খুব ভালো পারেন সে কাজটিই তিনি পাওয়ার চেষ্টা করতেন। তথাকথিত ‘‘যেকোনো একটি কাজ’’ খুঁজে বেড়াতেন না। এসব চিন্তাকে গভীরভাবে নাড়া দেবে এই বইটি। সেজন্য ছাত্র-অভিভাবক, কর্মজীবি, নতুন কর্মজীবি সকলের জন্য এটি পাঠ্য।

এছাড়া আমরা অনেক সময় কেবল যোগ্যতা অর্জনের কথা ভাবি। কিন্তু আমাদের মাঝে অনেক ভুল ত্রুটি এমনভাবে বাসা বেঁধে থাকে সেসব সমস্যা দোষ বা ভুলের কারণে আমরা আমাদের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে পারি না বরং অযোগ্যতার আস্ফালনে জীবনযাত্রার মহাসড়ক থেকে ছিটকে পড়ি। এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে। তাই এই বইতে আমাদের কিছু ভুল-ত্রুটির কথা আলোচনা করা হয়েছে। যেগুলো আমরা কাটিয়ে উঠতে পারি।

জাহাঙ্গীর আলম শোভন- রচিত নিজেকে গড়ে তুলতে গ্রন্থ থেকে।

Comments

comments

About The Author



Freelance Consultant, Writer and speaker . Jahangir Alam Shovon has been in Bangladeshi Business sector as a consultant, He has written near about 500 articles on e-commerce, tourism, folklore, social and economical development. He has finished his journey on foot from tetulia to teknaf in 46 days. Mr Shovon is social activist and trainer.