ওয়ালমার্ট এবং বাংলাদেশের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

2146

আগস্ট ৮, ২০১৬ তারিখে বিশ্বের বৃহত্তম রিটেইলার ওয়ালমার্ট ক্যাশ এবং শেয়ার মিলিয়ে ৩.৩ বিলিয়ন ডলারে জেট ডট কমকে কিনে নিয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে চারটি ফান্ডিং রাউন্ডে ৫৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসা শুরু করে জেট ডট কম। সে হিসেবে ছয়গুণ দামে প্রতিষ্ঠানটিকে কিনে নিয়েছে ওয়ালমার্ট। ইন্টারনেটে ব্রাউজ করতে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকাতেও এ খবরটি প্রকাশিত হয়েছে।

ওয়ালমার্ট এত টাকা দিয়ে জেট ডট কমকে কিনে নেবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তারা অ্যামাজন ডট কম এর সাথে পেরে উঠছে না। জেট ডট কম এর সিইও মার্কলোর নিজে একজন খুবই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ই-কমার্স ব্যবসায়ী এবং জেট ডট কম এর বোর্ডে যারা যারা আছে তাদের কয়েকজন আবার যুক্তরাষ্ট্রের ই-কমার্স সেক্টরের সেরা মাথা। এই মেধা এবং তাদের ব্যবসা স্ট্রাটেজিকেই মূলত ওয়ালমার্ট কিনে নিয়েছে।

মার্ক লোর কিডসি নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। কিডসির দুটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ছিল ডায়পার্স ডট কম এবং সোপ ডট কম। অ্যামাজনের সাথে এ দুটি ওয়েবসাইট পেরে উঠছিল না বিধায় ২০১০ সালে লোর ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে কিডসিকে অ্যামাজন এর কাছে বিক্রী করে দেন।

এরপরে গত বছরে তিনি জেট ডট কম চালু করেন। এ বছরের মে মাসেই জেট ডট কম ১ বিলিয়ন ডলার জিএমভি অর্জন করে। গ্রস মার্চেন্ডাইজ ভলিউম (জিএমভি) হচ্ছে একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাদের প্ল্যাটফর্মে কত পণ্য বিক্রী করে তার পরিমাণ। শুধু তাই নয় জেট ডট কম এর মার্কেটপ্লেসে ২৪০০ সেলার আছে যেখানে ওয়ালমার্ট এর মার্কেটপ্লেসে সেলারের সংখ্যা মাত্র ৬০০। জেট ডট কম মার্কেটপ্লেসে প্রায় ৩৪০০ ব্রান্ড এর ১কোটি ২০লাখ পণ্যের স্টক আছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন ২৫ হাজার অর্ডার প্রসেস করে এবং মাসে চার লাখ নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট করে।

জেট ডট কমকে কিনে নেবার পিছনে ওয়ালমার্ট এর আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে ওয়ালমার্ট যে ধরণের ক্রেতাদের নিয়ে কাজ করে জেট ডট কমও একই শ্রেণীর ক্রেতাদের নিয়ে কাজ করে।

যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ালমার্ট হচ্ছে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তদের শপিং মল। ইংরেজিতে যাদের বলা হয় “Price Sensitive Customer।” জেট ডট কমও অনলাইনে এ ধরণের ক্রেতাদের নিয়ে কাজ করে। তাদের প্রাইসিং স্ট্রাটেজিও সেভাবে তারা তৈরি করেছে। উদাহারণ দেই- জেট ডট কম এর মার্কেটপ্লেসে বেশ কিছু আইটেম আছে যেগুলো ক্রেতা যত বেশি কিনবে তাদের ডিসকাউন্টের হার তত বেশি হবে। এছাড়া অনেক পণ্য ক্রেতা চাইলে রিটার্ণ দিতে পারে কিন্তু সে যদি রিটার্ণ না দেয় তাহলে সে উক্ত পণ্য ডিসকাউন্ট পাবে।

এ অর্থ বছর শেষ হলে জেট ডট কম এর সিইও মার্ক লোর (Marc Lore)ওয়ালমার্ট গ্লোবাল ই-কমার্স ডিভিশনের সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেবেন।

এখন প্রথম কোটি টাকার প্রশ্নঃ ওয়ালমার্ট কেন এত মরিয়া হয়ে উঠেছে?

উত্তর হচ্ছে অ্যামাজন ডট কম। আয়ের  দিক থেকে ওয়ালমার্ট এখনো বিশ্বের বৃহত্তম রিটেইল অপারেটর।গত বছরের প্রতিষ্ঠানটি ১৩.৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। বর্তমানে ওয়ালমার্ট তাদের অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ১ কোটি ১০ লক্ষ পণ্য বিক্রী করছে এবং প্রতিমাসে আরো দশ লাখ নতুন পণ্য যোগ করছে।কিন্তু তাদের ই-কমার্স অ্যামাজন ডট কম এর মতো অতটা শক্তিশালী নয় এবং কোন ভাবে ওয়ালমার্ট ই-কমার্সে অ্যামাজন এর সাথে এঁটে উঠতে পারছে না।

সমস্যা হলো যে অ্যামাজন ডট কম যেভাবে ই-কমার্সকে সিরিয়াসলি নিয়ে কাজ করেছে ওয়ালমার্ট সেটা করে নি।ওয়ালমার্ট বিশ্বের বৃহত্তম রিটেইলার। বিশ্বজুড়ে তাদের ১১ হাজারের বেশি দোকান আছে এবং এটাই তাদের মূল শক্তি। ই-কমার্স তাদের মূল ফোকাস ছিল না। এই দূর্বলতাই এখন তাদের ব্যবসার অস্তিত্বের জন্যে বিশাল হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

1

Image source: Learn Bonds

কিন্তু এমন নয় যে ওয়ালমার্ট ই-কমার্সে চেষ্টা করেনি। তারা বেশ কয়েকবছর ধরে তাদের ই-কমার্স ডিভিশনকে গড়ে তোলার কাজ করেছে। ২০১১ সালে ওয়ালমার্ট কসমিক্স নামে একটি স্টার্ট-আপ কে কিনে নেয় এবং কসমিক্স এর কর্মচারীদের নিয়ে ওয়ালমার্ট রিসার্চ ল্যাবস নামে একটি ই-কমার্স রিসার্চ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৩ সালে সিলিকন ভ্যালিতে ওয়ালমার্টের বিভিন্ন অফিসে ১,৫০০ এর বেশি একজিকিউটিভ কর্মকর্তা কাজ করছিলেন এবং ওয়ালমার্ট তাদের ই-কমার্স ডিভিশনকে শক্তিশালী করার জন্যে আরো লোক নিয়োগ দেয়। এছাড়াও গত বছরে ওয়ালমার্ট তাদের ই-কমার্স ডিভিশনে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা প্রদান করে।

২০১২ সালে নীল অ্যাশ (Neil Ashe) কে ওয়ালমার্ট গ্লোবাল ই-কমার্স অপারেশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে নীল জনপ্রিয় টেক-ওয়েবসাইট সি-নেট এর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নীল এর নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে ওয়ালমার্ট এর অনলাইন সেলস বিগত পাঁচ বছর ধরে গড়ে ২০% হারে প্রবৃদ্ধি লাভ করে।কিন্তু তিনি আশানুরুপ ফলাফল আনতে পারেননি।

পারলে ঠেকাও অ্যামাজন ডট কম:

হাসি পেলেও যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজন ডট কম এর অবস্থা এখন এরকম। যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্বের অন্যতম বড় এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে লাভের মুখ দেখেনি কিন্তু অবস্থা এখন বদলাতে শুরু করেছে।

গত বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে অ্যামাজন লাভ করে ৪৮২ মিলিয়ন ডলার এবং এর পরের দুই কোয়ার্টারে অ্যামাজন লাভ করে ৫১৩ মিলিয়ন এবং ৮৫৭ মিলিয়ন ডলার। এই বছরের প্রথম ছয়মাসে অ্যামাজন ডট কম লাভ করেছে ১.৩৭ বিলিয়ন ডলার।

AmazonProfitability1

অ্যামাজন এর বিনিয়োগকারীরাও অ্যামাজন এর নিয়মিত লাভের খবরে সন্তুষ্ট। বর্তমানে অ্যামাজনের মার্কেট ক্যাপিটাল ৩৬৫.২ বিলিয়ন ডলার। অ্যাপল, অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট এর পরে অ্যামাজন যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ বৃহত্তম পাবলিক লিমিটেড প্রতিষ্ঠান।

স্লাইস ইন্টেলিজেন্স নামক একটি ডাটা অ্যানালাইসিস প্রতিষ্ঠান বলে যে ২০১৫ সালের সাইবার মনডে-তে যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনে যে পরিমাণ কেনাকাটা করেছে তাতে অ্যামাজন ডট কম এর শেয়ার ৩৬.৫%।

অ্যামাজন এর আয়:

২০১২ থেকে ২০১৫ এর মধ্যে অ্যামাজন এর আয় ২০.৫% বার্ষিক যৌগিক (Compound Annual Growth Rate) হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যামাজন এর বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা থেকে এ আয় হয়েছে। অ্যামাজন এর অনলাইন রিটেইল বা ই-কমার্স ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৬০% আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং ৩৩% আন্তর্জাতিক বাজার থেকে। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এ ডব্লিউএস) থেকে আসে ৭%। বর্তমানে এ ডব্লিউ এস অ্যামাজন এর সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা এবং এটি খুবই দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ ডব্লিউ এস থেকে ৭১৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে অ্যামাজন ডট কম।

উত্তর আমেরিকাতে অ্যামাজন নিজে সরাসরি পণ্য বিক্রী করে আবার একই সাথে কমিশনের বিনিময়ে বিভিন্ন মার্চেন্টদের পণ্য তাদের মার্কেটপ্লেসে বিক্রী করে। পণ্যের ধরণের উপরে ভিত্তি করে অ্যামাজনের কমিশন ৮%-২৫% এ ওঠানামা করে।

গত বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে সারা বিশ্বে অ্যামাজন এর মার্কেটপ্লেসে যত পণ্য বিক্রী হয় তার ৪৫% ছিল অ্যামাজন মার্চেন্টদের। এ বছরে সেই শেয়ার বেড়ে ৪৯% হয়েছে। আর ডব্লিউ বেয়ার্ড অ্যান্ড কো এর সিনিয়র অ্যানালিস্ট কলিন সেবাস্টিয়ান (Colin Sebastian) বলেন যে গত বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে অ্যামাজন সেলাররা মার্কেটপ্লেসে ৩০ কোটি ৪০ লক্ষ পণ্য অফার করেছিল এবং এ বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে তারা ৩৭ কোটি ২০ লক্ষ পণ্য অফার করে।

গত বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে অ্যামাজন এর যুক্তরাষ্ট্রের মার্কেটপ্লেসে বিক্রী হওয়া পণ্যের মধ্যে থার্ড পার্টি সেলারদের পণ্যের শেয়ার ছিল ৯১%। এ বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২%।

ফুলফিলমেন্ট বাই অ্যামাজন:

অ্যামাজন এর থার্ড পার্টি সেলারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আবার ফুলফিলমেন্ট বাই অ্যামাজন (এফবিএ) সেবা ব্যবহার করে থাকে। এ বছরের শুরুর দিকে অ্যামাজন এর প্রধান ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার ব্রায়ান ওলসাভস্কি (Brian Olsavsky) বলেন যে গত বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে অ্যামাজন মার্কেটপ্লেসের বিক্রী হওয়া পণ্যের ৫০% এফবিএ এর মাধ্যমে এসেছে। যেসব মার্চেন্ট এফবিএ ব্যবহার করে থাকেন তাদের একটি বড় সুবিধা হচ্ছে তাদের পণ্য অ্যামাজন এর প্রাইম লয়াল্টি প্রোগ্রামের সদস্যদের কাছেও বিক্রী হয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন ক্রেতাদের মধ্যে অ্যামাজন নিজেদের অবস্থান ভালভাবে তৈরি করে নিয়েছে। অ্যালেক্সা ইঙ্ক এর প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে যে আগস্ট ৭, ২০১৬ পর্যন্ত ৩০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজন ওয়েবসাইটে ১১ কোটি ৯ লক্ষ ভিজিটর আসে অর্থাৎ দেশটির প্রতি তিনজনে একজন অ্যামাজন ওয়েবসাইট ভিজিট করে। তারা অ্যামাজনের ৭৬ কোটি ৮৯ লক্ষ পেইজ ভিউ করে। এরপরে আছে ই-বে। এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি ৬ কোটি ৩৫ লক্ষ ভিজিটর পেয়েছে এবং ২৯ কোটি ৩৪ লক্ষ পেইজ ভিউ পেয়েছে।

গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজন মার্কেটপ্লেসে অ্যামাজনের নিজস্ব এবং সেলারদের পণ্য মিলিয়ে ১১২৮০ কোটি ডলারের পণ্য বিক্রী করে। দেশটির অনলাইন রিটেইলে অ্যামাজন এর শেয়ার ছিল ৩৩%। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন রিটেইল মার্কেটে অ্যামাজনের শেয়ার ছিল ২৯.২%।

অ্যামাজন প্রাইম:

অ্যামাজনের বিক্রী বৃদ্ধিতে অ্যামাজন প্রাইম লয়াল্টি প্রোগ্রামের একটি বিশাল ভূমিকা আছে। বছরের ৯৯ ডলার দিয়ে লোকে অ্যামাজন প্রাইম এর সদস্য হতে পারে। অ্যামাজন প্রাইম সদস্যরা ফ্রি-শিপিং মিউজিক স্ট্রীমিং, ভিডিও স্ট্রীমিং, ই-বুক, অনলাইন স্টোরেজ সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে।এছাড়াও প্রাইম সদস্যদের জন্যে অ্যামাজন স্টুডিও নিজস্ব টিভি সিরিজ নির্মাণ করে।এ বছরে অ্যামাজন এর টিভি সিরিজ “মোজার্ট ইন দ্যা জাঙ্গল” দুটি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছে।

2

সিকিউরিটিজ রিসার্চ ফার্ম কঞ্জিউমার ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ পার্টনার্স এলএলসি (সিআইআরপি) এর তথ্য মতে এ বছরের জুন মাসের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে ৬কোটি ৩০ লক্ষ লোক অ্যামাজন প্রাইমের সদস্য। ২০১৫ এর জুন মাসে এ সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৪০ লক্ষ। সিআইআরপি বলে যে অ্যামাজন প্রাইম এর সদস্যরা বছরে গড়ে ১২০০ ডলারের কেনাকাটা করে থাকে অ্যামাজন ডট কম থেকে।

এ বছরের এপ্রিল মাসে ইন্টারনেট রিটেইলার যুক্তরাষ্ট্রের ৫৩৫ জন প্রাপ্ত বয়স্ক অনলাইন ক্রেতার উপরে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা যায় যে অংশগ্রহণকারীদের ৯৪.৫% মাসে নূন্যতম দুইবার অনলাইনে কেনাকাটা করে থাকে। এরা হচ্ছে “Frequent Shopper” এবং তারা অ্যামাজনে কেনাকাটা করে থাকে। এদের মধ্যে ৭১% আবার অ্যামাজন প্রাইম সদস্য। এই ৯৪.৫% ক্রেতার ৫৪.৮% বিগত ১২ মাসে তাদের অনলাইনে কেনাকাটার ৫১% বা তার বেশি অ্যামাজন থেকে করেছে।

মিলওয়ার্ড ব্রাউন ডিজিটাল এর মতে প্রাইম প্রোগ্রামের সদস্যরা অ্যামাজন ডট কম এ প্রতি ১০০ ভিজিটে ৭৪ ভিজিটেই পণ্য কেনেন। আর কোন ই-কমার্স সাইটের এত উচ্চ ভিজিটর কনভার্সন রেট নাই।

এ বছরের শুরুতে কোয়েন অ্যান্ড কম্পানি বলে যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮% পরিবার অ্যামাজন প্রাইম ব্যবহার করে অর্থাৎ প্রতি ৫টি পরিবারের ২টি অ্যামাজন প্রাইম প্রোগ্রামের সদস্য।  প্রতিষ্ঠানটি ২৫০০ ক্রেতার উপরে একটি জরিপ চালিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করে।

3

জরিপে দেখা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ এবং স্বচ্ছল লোক যাদের গড় আয় ৬৯ হাজার ডলারের উপরে তারা অ্যামাজন প্রাইম এর সদস্য হচ্ছে (উপরের ছবি) প্রাইম সদস্যদের গড় বয়স ৩৬.৫ বছর।

অ্যামাজনে ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি কেনে কাপড়-চোপড়। প্রাইম সদস্যদের কাপড়-চোপড় কেনা ২০১৪ সালের নভেম্বরের তুলনায় ২০১৫ এর নভেম্বরে ৩৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালে অ্যামাজন কাপড়-চোপড় বিক্রীতে মেসি’স কে ছাড়িয়ে যাবে। মেসি’স যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি বড় ক্লথিং রিটেইলার।

মোবাইলেও এগিয়ে অ্যামাজন ডট কম:

সিমিলার ওয়েব এর প্রদত্ত তথ্যমতে অ্যাপ ইন্সটলেশনেও অ্যামাজন এগিয়ে আছে ওয়ালমার্টের তুলনায়। এ বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত অ্যাণ্ড্রয়্ডে ডিভাইসে অ্যামাজন ডট কম এর শেয়ার ৩৬.৫% এবং ওয়ালমার্ট ৮.২%। অ্যাপ ইন্সটলেশনে অ্যামাজন এবং ই-বে এর পরেই ওয়ালমার্ট।

দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে ওয়ালমার্ট:

বিগত দশকে অ্যামাজন এর সাথে তাল মেলাতে ওয়ালমার্ট ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে কিন্তু কোন ভাবেই তারা অ্যামাজন এর কাছাকাছি সাফল্য লাভ করতে পারেনি।শুধু ওয়ালমার্ট কেন অন্য আর কোন রিটেইলারও অনলাইনে অ্যামাজন এর ধারে কাছে আসতে পারেনি।

এ বছরের শুরুতেই সংবাদ প্রকাশিত হয় যে ওয়ালমার্ট তাদের ২৬৯ টি স্টোর বন্ধ করে দেবে যার মধ্যে ১৫৪টি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। শুধু ওয়ালমার্ট নয় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি অনলাইনে কেনাকাটা বৃদ্ধির কারণে হয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে নতুবা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

ভারতে অ্যামাজন ডট কম:

অ্যামাজন ইন্ডিয়া ভারতে এখন সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনলাইন শপিং ব্রান্ড ট্রাস্ট রিসার্চ অ্যাডভাইজরি (টিআরএ)নামক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের রিপোর্টে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। “দ্যা ব্রান্ড ট্রাস্ট রিপোর্ট ইন্ডিয়া স্টাডি ২০১৬” শিরোনামের এ রিপোর্ট প্রস্তুত করার জন্যে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের ১৬টি শহরের ২,৫০০ লোকের উপরে জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বয়স সীমা ২১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যারা প্রথম দশ এর মধ্যে আছে তারা হলো ই-বে, মিন্ত্রা, ইয়েপমি, জাবং, নাপতোল, শপক্লুজ এবং আসকমিবাজার

অ্যামাজন ইন্ডিয়ার বিশ্বস্ততার হার ৩৬%। স্ন্যাপডিল এবং ফ্লিপকার্ট সম্মিলিত ভাবে ৪০%। আপনি চাইলে নীচের এই লিঙ্ক থেকে রিপোর্টটির একজিকিউটিভ সামারি ডাউনলোড করে পড়তে পারেন।

www.trustadvisory.info/pdf/Brand%20Trust.pdf

অ্যামাজন ভারতে দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং আরো তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে।

সম্প্রতি অ্যামাজন দিল্লীর হরিয়ানাতে দুই লক্ষ বর্গফুটের একটি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালু করেছে।এটি এখন পর্যন্ত ভারতে তাদের সবচেয়ে বড় ফুলফিলমেন্ট সেন্টার। এ নিয়ে অ্যামাজন ভারতে ২২টি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার তৈরি করেছে এবং আরো পাঁচটি এ বছরের মধ্যেই নির্মাণ করে ফেলবে।

SONY DSC

Image source: MCR World

অ্যামাজন ইন্ডিয়ার ৮০% মার্চেন্ট তাদের এই ফুলফিলমেন্ট সেন্টার ব্যবহার করে কাস্টমারকে ডেলিভারি দেয়। ভারতে অ্যামাজনের গত বছরে ২৫০% প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

ইতিমধ্যেই স্ন্যাপডিলকে অ্যামাজন ইন্ডিয়া পিছনে ফেলে দিয়েছে এবং ফ্লিপকার্ট যদি সতর্ক না হয় তাহলে তাদেরকে পেছনে ফেলে ভারতের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হবে অ্যামাজন ইন্ডিয়া।

এ বছরের মার্চে ভারতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো দিনে গড়ে ৮-৯ লাখ পণ্য ডেলিভারি দেয় যার তিন চতুর্থাংশ ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিল এবং অ্যামাজন ইন্ডিয়া সমন্বিতভাবে করে। গত বছরের মার্চে ফ্লিপকার্টের শিপমেন্টের শেয়ার ছিল ৪৩% কিন্তু এই বছরের মার্চে তা কমে ৩৭% হয়েছে।

5

গত বছরের মার্চে স্ন্যাপডিলের শিপমেন্ট শেয়ার ছিল ১৯% সেখান থেকে এ বছরের মার্চে তাদের শিপমেন্ট শেয়ার কমে ১৪%-১৫% এ চলে এসেছে। অন্যদিকে ২০১৫ সালের মার্চে অ্যামাজন ইন্ডিয়ার শিপমেন্ট শেয়ার ছিল ১৪% সেখান থেকে এ বছরের মার্চে শিপমেন্ট এর শেয়ার ২১%-২৪%।

শো-রুমিং:

বিগত কয়েকবছরে যুক্তরাষ্ট্রের দোকান গুলোতে বিক্রী কমে গিয়েছে। লোকজন দোকানে গিয়ে বিভিন্ন পণ্য ছুঁয়ে দেখে কিন্তু কেনে না। সে হয়তো বা দোকানে থাকা অবস্থায় তার স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস ঘেঁটে দেখছে বা দোকানে পণ্য দেখে পছন্দ হবার পরে বাসায় এসে অনলাইনে কিনছে। এই ঘটনাকে বলা হচ্ছে শো-রুমিং হচ্ছে। ইন্টারনেটে আপনি Showrooming লেখে সার্চ দিলে তথ্য পাবেন।

বেস্ট বাই এরকম একটি প্রতিষ্ঠান এদের নিয়ে আমি ই-ক্যাব ব্লগে পোস্ট দিয়েছিলাম সেটা দেখে আসতে পারেন।ওয়ালমার্টও এই সমস্যায় পড়েছে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয় চীনের বড় বড় দোকানগুলোও এই শো-রুমিং সমস্যায় ভুগছে।

ভারতে শো-রুমিং হচ্ছে কিনা এ সম্পর্কে আমি এখনো কোথাও কোন তথ্য পাই নি তবে ভারতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রীতিমতো ই-কমার্স নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। কিছুদিন আগেই আমি ভারতের বিখ্যাত টাটা গ্রুপ এর ওমনি-চ্যানেল ই-কমার্স ব্যবসা টাটা ক্লিক চালু করার উপরে ই-ক্যাব ব্লগে পোস্ট দিয়েছি।

আদিত্য বিড়লা, মাহিন্দ্র সহ ভারতের প্রথম সারির বিজনেস হাউসগুলো এখন ই-কমার্সে চলে আসছে। ই-কমার্স যেভাবে ভারতে বাড়ছে এবং অ্যামাজন যেভাবে বিনিয়োগ করছে তাতে এসব প্রতিষ্ঠান গুলো যদি ই-কমার্সে না আসে তাহলে তাদের অবস্থাও ওয়ালমার্ট এর মতো হবে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।

এখন দ্বিতীয় কোটি টাকার প্রশ্নঃ বাংলাদেশে কি এ ধরণের পরিস্থিতির উদ্ভব হবে অদূর ভবিষ্যতে?

হ্যা হবে। ২০১৪ এর আগে যদি এ প্রশ্ন করা হতো তাহলে হয়তো উত্তর হতো যে এরকম অবস্থায় পৌঁছুতে আমাদের অন্তত দশ বছর সময় লাগবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে কারণ ২০১৪ সাল থেকে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) যাত্রা শুরু করেছে। ই-ক্যাব দেশের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের জন্যে একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে যেখানে তারা এক হয়ে ই-কমার্সের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এই যে সকলের মিলিত প্রচেষ্টা, তার ফলে এই দুই বছরে পরিস্থিতি ব্যাপক বদলে গিয়েছে। আগামী বছরে ই-কমার্স আরো জনপ্রিয় হবে এবং ভারত, চীন, সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এ সেক্টরে বিনিয়োগ আসবে। তাই বাংলাদেশের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো যদি এখন থেকে সচেতন হয়ে ই-কমার্সে না আসে তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

6

ই-ক্যাব প্রেসিডেন্ট রাজিব আহমেদ কিছুদিন আগে অর্থসূচকের আলোচনা সভায় একই কথা বলেন। ২৩ জুলাই ২০১৫ অর্থসূচক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত “ই-কমার্স: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় বিষয়ক আলোচনা” সভাতে তিনি বলেন যে বাংলাদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বড় দূর্বলতা হলো যে এ ধরণের পরিবর্তন বা আগামীতে কি হতে পারে সেটা নিয়ে তারা গুরুত্ব দেয় না। কোন নতুন ট্রেন্ড উন্নত বিশ্বে চালু হবার অন্তত পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় পরে বাংলাদেশে শুরু হয়। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি একই উদাসীনতা প্রদর্শন করে তাহলে তারা  বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হবে। একই সাথে দেশের লোকেরও ক্ষতি হবে কারণ অনেকে তখন চাকুরি হারাবে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি করা যেতে পারে?

প্রথমত আমাদের দেশের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকেই ই-কমার্সে কাজ শুরু করে দিতে হবে। সাইট তৈরি, মার্কেট স্টাডি, কি কি পণ্যের চাহিদা আছে? সেইলস স্ট্রাটেজি কি হবে? শো-রুমিং এড়াতে কি করতে হবে? এগুলো দেখতে হবে এবং সেজন্যে গবেষণা করতে হবে। টাটা গ্রুপ ভারতে তাই করেছে। তারা কয়েক’শ কোটি রুপি খরচ করে গবেষণা করে, সেভাবে ভাল সাইট তৈরি করে তারপরে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন থেকেই ই-কমার্সের উপরে উচ্চতর ডিগ্রী চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ ই-কমার্সে দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। এখন চালু করলে ই-কমার্স গ্রাজুয়েট পাস করে বের হতে আরো পাঁচ বছর সময় লাগলে। সরকার, পাবলিক, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে এ ব্যাপারে মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এখন যদি তা না করা হয় তাহলে ভারত, শ্রীলংকা থেকে লোক এনে কাজ করানো হবে এবং আমাদের তরুণ-তরুণীরা সুযোগ হারাবে।

সূত্র:

অর্থসূচক

ব্লুমবার্গ

সিএনবিসি

ফর্চুন (১)

ফর্চুন (২)

ফর্চুন (৩)

ইন্টারনেট রিটেইলার (১)

ইন্টারনেট রিটেইলার (২)

ইন্টারনেট রিটেইলার (৩)

ইন্টারনেট রিটেইলার (৪)

ইন্টারনেট রিটেইলার (৫)

ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস

লাইভমিন্ট

পিসি ট্যাবলেট

টেক স্টোরি

দ্যা ইকনোমিক টাইমস

Comments

comments