Wari Meena bazar

ই-কমার্স সেক্টরের পরিধি ও ই-ক্যাব

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

শুরু থেকে ই-কমার্সের উন্নয়নে কাজ করছে ই-ক্যাব। ডিজিটাল কমার্স উদ্যোক্তাদের একটা বৃহৎ অংশ ই-ক্যাবের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণলায় অধিভূক্ত এবং এফবিসিসিআই তালিকাভূক্ত ই-কমার্স সেক্টরের একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হিসেবে ই-ক্যাব কাজ করে আসছে। ১৫শ সদস্য প্রতিষ্ঠান, ২৯ টি উপকমিটি ও ১৭ জনের দাপ্তরিক জনবল নিয়ে ই-ক্যাবের ৯ সদস্যের কার্যনির্বাহী পরিষদ বিগত ৬ বছরে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ৬ হাজার উদ্যোক্তাকে, সেমিনার আয়োজন করেছে প্রায় শতাধিক, দেশব্যাপী অর্ধশতাধিক ওয়ার্কশপ আয়োজন ও অসংখ্য মতবিনিময় সভা আয়োজন করেছে। ই-কমার্স সেক্টরের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের সাথে একসাথে কাজ করছে ই-ক্যাব।

বিগত করোনাকালীন সময়ে দেশব্যাপী নিত্য পণ্যের সচলতা, লকডাউন এলাকায় ঘরে ঘরে পণ্যসেবা, ডিজটাল হাটে গরু বিক্রি করে তা প্রসেস করে ক্রেতার বাসায় পৌঁছে দেয়া, বাগানের আম অনলাইন বাণিজ্য মেলায় বিক্রির ব্যবস্থা, করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে যাওয়া পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং স্কুল শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে মেধাবিকাশের সুযোগ করাসহ উল্লেখযোগ্য কর্মসূচী সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ই-ক্যাব যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে চলেছে। যা ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। সরকারী স্বীকৃতিস্বরুপ মিলেছে ‘‘ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরষ্কার ২০২০’’। ই-ক্যাবের এই সফলতার মূলে রয়েছে সরকারের সহযোগিতা, খাতসংশ্লিষ্টদের সাড়া, টিম ই-ক্যাবের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ই-ক্যাব সদস্যদের একনিষ্ঠ সেবা। এতদসংক্রান্ত কারণে ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দপ্তরের ৯ জন কর্মকর্তাসহ মোট ১২ জনকে দেয়া হয়েছে ‘‘ই-কমার্স মুভার্স এ্যাওয়ার্ড ২০২০’’।
এছাড়া ডিজিটাল কমার্স পলিসি, আইসিটি পলিসি, জাতীয় শিষ্ঠাচার নীতিমালা, ভ্যাট ও ট্যাক্স সংক্রান্ত পর্যালোচনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মূদ্রানীতিসহ বিভিন্নক্ষেত্রে ই-ক্যাব এই খাত সংশ্লিষ্ঠদের মতামত সংকলন করে পেশ করেছে। ফলে সরকার বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আইসিটি ডিভিশন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন প্রভৃতি সরকারী দপ্তর ছাড়াও আন্তজাতিক সংস্থার মধ্যে আইসিটি, শী ট্রেডস, এফএনএফ এর সাথে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে ই-ক্যাব।

বর্তমানে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ, আইসিটি ডিভিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, বাংলাদেশ ব্যাংক, চিনিও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন দপ্তরে ই-কমার্সের উন্নয়নে পেশ করা প্রস্তাবনাসমূহ বিবেচনাধীন রয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারী ‘‘ই-ক্যাব একশন প্লান ২০২১’’ এর মাধ্যমে অন্যান্য বিষয়ের সাথে চলতিবছর ৪টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করার ঘোষনা দেয়া হয়। আগামী ৭ এপ্রিল ঢাকায় ‘‘রুরাল টু গেøাবাল সামিট ২০২১’’ নামে একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে। আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট নিয়েও ই-ক্যাব ইতোমধ্যে বেশকিছু দপ্তরে প্রস্তাবনাসমূহ পেশ করেছে।

১. প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরী

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগ ছাড়াও আন্তজাতিক সংস্থা She Trade, FNF এর সাথে যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। এ যাবত ৫ হাজার তরুনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। যাদের ৪০ শতাংশ নারী। এরা বেশীরভাগই উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে কেউ কেউ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে।

২. মেলা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে আস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি

ই-ক্যাব বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ও মহিলা অধিদপ্তরের সাথে যৌথভাবে প্রতিবছর দেশের ৮টি বিভাগে ই-কমার্স মেলা আয়োজন করছে। এতে করে রাজধানীর বাইরে ই-কমার্সের ব্যপ্তিতে ভূমিকা রাখছে। চলতি বছর করোনার কারণে মেলা স্থগিত রয়েছে। তথাপি এবারের বাণিজ্য মেলা ভার্চুয়ালি আয়োজনের প্রস্তাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে ই-ক্যাব। চলতি বছর ভার্চুয়াল ডিজিটাল ওয়াল্ডে প্রায় একশ এর মতো স্টল বরাদ্দ নিয়েছে ই-কমার্স সেক্টর।

৩. পণ্য ও সেবার পরিধি বৃদ্ধি

বর্তমানে দেশে ই-কমার্সের মাধ্যমে বেশী বিক্রি হচ্ছে গ্যাজেট, পোশাক ও বই। সাম্প্রতিক সময়ে করোনার কারণে নিত্যপণ্য এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর বেচাবিক্রিও বেড়েছে। পণ্য ও সেবা বৃদ্ধির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চলতি বছর ই-ক্যাবের সহযোগিতায় আয়োজন করে অনলাইন আমমেলা। এতে প্রায় ১৫২ হাজার কেজী আম বিক্রি হয়।। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এর সাথে যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করে অনলাইন কুরবানি হাট। যাতে প্রান্তিক কৃষকের গরু বিক্রিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে এই উদ্যোগ।

৪. অর্থ সংযোগ

ই-কমার্স সেক্টরে ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগ প্রাপ্তিতে ব্যাপট ঘাটতি রয়েছে। তাই ই-ক্যাব বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযোগ ঘটিয়ে অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ ও বিনিয়োগ এর সংকুলান করেছে। এর পরিমাণ কম হলেও। আর্থিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসায় এই সেক্টরে আশার সঞ্চার হয়েছে।

৫. উদ্যোগ সহজীকরণ

ইতোমধ্যে ই-ক্যাবের মেম্বারশিপ প্রক্রিয়া সহজিকরণ করা হয়েছে। যেকোনো উদ্যোক্তা দেশের যেকোনো অঞ্চলে বসে অনলাইনে আবেদন করে ই-ক্যাবের সদস্য হতে পারে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স তালিকায় ই-কমার্স ক্যাটাগরি সংযুক্ত করা, কম খরচে ও সহজে ই-কমার্স ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির সুযোগ সংক্রান্ত ই-ক্যাবের একটি আবেদন বর্তমানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে।

৬. দেশের প্রত্যন্ত অঞ্ছলে ই-কমার্সের ব্যাপ্তি

বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করে। এবং আমাদের ভোগ্যপন্যের একটা বিরাট অংশ গ্রামে উৎপাদিত হয়। ফলে গ্রাম ও শহরের সংযোগ জরুরী। অনলাইনের মাধ্যমে এই সংযোগ ত্বরান্বিত হলে ই-কমার্স দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করবে। সেজন্য ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা শহরে ই-ক্যাব সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরীতে কাজ করছে।

৭. সেবার মাধ্যমে আস্থা অর্জন

ঘরে ঘরে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে বিলাসী পণ্য সরবরাহ করছে অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। যাতে সময়মতো সঠিক পণ্য সঠিক দামে ক্রেতার কাছে পৌঁছতে পারে এজন্য ই-ক্যাব কাজ করছে। ই-ক্যাবের কার্যনির্বাহিী পরিষদ ক্রেটারিয়েট ও ১৬টি স্ট্যান্ডিং কমিটি ভিন্ন ভিন্ন সেক্টর নিয়ে কাজ করছে। একই সাথে সেবার মান ও দামসহ সার্বিক মান উন্নয়নে বাজারের উপর নজরদারীসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

৮. প্রচারণার মাধ্যমে বাজার বিস্তৃতি

প্রচারণারার মাধ্যমে ভোক্তাদেরকে সচেতন করা এবং উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণীত করার জন্য কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ই-ক্যাব। বিভিন্ন কর্মসূচী ভিত্তিক প্রমোশন ও প্রেস রিলিজ ছাড়াও করোনাকালীন সময়ে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলনেরও আয়োজন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ই-ক্যাব।

এছাড়া চলতিবছর করোনাকালীন সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের অনুমতি ও সহযোগিতায় সারাদেশে নিত্যপন্যের সাপ্লাইচেইন সচল রাখতে কাজ করে ই-ক্যাব। এতে করে ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমও বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করেছে।

আরো যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন

১. ট্রেড লাইসেন্সে ই-কমার্স বিজনেস ক্যাটাগরি যুক্ত করতে হবে এবং স্বল্প ফিতে  ট্রেড লাইসেন্স করার সুযোগ থাকতে হবে। অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস স্থাপন এবং বাড়ীভাড়ার বাধ্যকতা থাকা বাস্তবসম্মত হবেনা।

২. বৈদেশিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে বর্তমানে অনলাইন উদ্যোক্তাগণ অনলাইনে বিজ্ঞাপন ও বুদ্ধিভিত্তিক পণ্যক্রয়ের ক্ষেত্রে বেসিস সদস্যদের ন্যায় কোনো সীমা ভোগ করতে পারছেনা। বর্তমানে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা বাংলাদেশ ব্যাংকে বিবেচনাধীন রয়েছে।

৩. বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে জেলা ভিত্তিক ওয়ার হাউজ স্থাপন করে। অনলাইন উদ্যোক্তাদের সেবাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়ার একটি প্রস্তাব ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। উক্ত প্রস্তা্বটি বাস্তবায়িত হলে সেবার মান উন্নত হবে এবং ই-কমার্সের পরিধি বাড়বে।

৪. ক্রসবর্ডার ই-কমার্সের ক্ষেত্রে পণ্য শিপমেন্ট প্রক্রিয়া, শিপমেন্ট খরচ ক্রস বর্ডার ই-কমার্সের মাধ্যমে প্রেরিত পণ্যকে রফতানী পন্যের আওতায় বিবেচনা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এটা না হলে ক্রস বর্ডার ই-কমার্সখাতে বিদ্যমান ৭৪% প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

লেখক: জেনারেল ম্যানেজার, ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

3,011 total views, 4 views today

Comments

comments