saheb no 01831034343 (47) - Copy

 ই কমার্স বনাম প্রচলিত ব্যবসায়
লেখক: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
এটা সুবিধা-অসুবিধা আর ভালো-মন্দের প্রশ্ন নয়। প্রচলিত ব্যবসায় কিছু সুবিধা আছে, আছে হয়তো অসুবিধাও আর ই কমার্সে সুবিধা অসুবিধাতো আছেই। কিন্তু আজকের আলোচনা নেহায়েত মিল-অমিল নিয়ে। অর্থাৎ এই দুটো ব্যবসায়ের মধ্যে কি কি মিল বা অমিল রয়েছে। কেউ যদি প্রচলিত ব্যবসার সাথে একটি অনলাইন শপও রাখেন তাহলেতো দুইটি শপেরই সুবিধা পেতেপারে আবার কেউ যদি অনলাইন শপের সাথে একটি আউটলেট রাখেন তিনিও তো একইভাবে দুটো সুবিধা নিতে পারেন।
এই মিল-অমিল আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যারা অনলাইন ব্যবসা করেন তারা যেন একে খুব আলাদা কিছু বা কঠিন কিছেু মনে না করেন। কেউ যেন খুব সহজ কিছু বা একেবারেই একই জিনিস মনে না করেন। যার প্রচলিত ব্যবসায় সম্পর্কে ধারণা আছে তিনি যদি প্রচলিত ব্যবসা দিয়েই ই কমার্সকে বুঝতে চান তাহলে এই লেখা তার জন্য সহায়ক হবে। তাহলে মূল কথায় আসা যাক।

11939316_10207562774973618_1118550826_o

ছবি: হুমায়ন কবীর ভাই।
০১. ই কমার্স প্রচলিত ব্যবসায়ের মতোই একটা ব্যবসায়, কেবল প্লাটফরমটা আলাদা। যেমন ধরুন দুইজন শিল্পী- একজন মঞ্চে অভিনয় করেন আরেকজন করেন টিভিতে।
০২. ই কমার্স ব্যবসায় প্রচলিত ব্যবসায়ের মতোই সব কাজ রয়েছে। যেমন পন্য কেনা-বেচা, সংরক্ষণ করা, লাভ লোকসা, হিসাব পত্র, বিপনন, বিজ্ঞাপন, পরিবহন, কাস্টমার সস্তুষ্টি : এক কথায় সব।
০৩. ই কমার্সে কিছু অতিরিক্ত কাজ করতে হয় যেমন পন্যের ছবি তুলতে হয়, সুন্দর করে পোস্টে দিতে হয়, পেমেন্টটা সরাসরি গ্রহণ না করে কোনো মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়, পন্যটা খুব সুন্দর ভাবে প্যাক করে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠাতে হয়, এমনকি পন্যটা পেয়েছে কিনা খবরও নিতে হয়।
০৪. ফিজিক্যাল একটি শপে ক্রেতা দেখে- শুনে- ধরে- দরদাম করে পন্য কিনলো, কোনো কারণে ফেরত দিতে চাইলে আপনি বলতেই পারেন ‘‘আপনি নিজে দেখেই কিনেছেন’’। কিন্তু অনলাইন শপে একটা ভয় থাকেই, অনেক সময় পন্যের আসল চেহারা দেখে কাস্টমার মত পাল্টায়। বিশেষ করে ক্যাশ অন ডেলিভারী হলে অনেক সময় ডেলিভারী নিতে চায়না, ফিরিয়ে দেয়, এমনটা অনেকেই বলেন।
অনেকেই এই অভিযোগ করে থাকেন। এই সমস্যার জন্য প্রথমত ছবিটা এমন ভাবে তুলবেন যেন পন্যের নেচারাল কালারটা আসে। দ্বিতীয়ত সব ধরনের ইনফরমেশন আগেই দিয়ে দেবেন। তৃতীয়ত কার্ডের মাধ্যমে ওপিজিতে পেমেন্ট নিতে পারেন। সর্বশেষ পন্য প্যাক করে পাঠানোর আগে কাস্টমারের সাথে একবার ফোন করে নিশ্চিন্ত হয়ে পন্য পাঠাবেন।
০৫. এটা একটা টেকনোলজি বেজড ব্যবসায়, এই ব্যবসায় করার জন্য আপনার যেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দরকার, তেমনি দরকার ব্যবসায়িক জ্ঞান ও টেকনোলজি সম্পর্কে ধারণা। পর্যাপ্ত ধারণা থাকার পরও আপনাকে রেগুলোর আপডেট থাকেতে হবে, নতুন পন্য ও টেকনোলজি সম্পর্কে জেনে রাখতে হবে। সব সময় লেখাপড়া মানে জানার মধ্যে থাকতে হবে। ট্রাডিশনাল একটা ব্যবসায় বা শপের জন্য আপনার এটা দরকার নাও হতে পারে। বিশ্বখ্যাত ধণী বিল গেটস এখনো প্রতি সপ্তাহে একটা করে বই পড়েন। ছাত্র জীবন যাওয়ার র্পও তার এই অভ্যাসের কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। দিক নির্দেশনামূলক বইগুলো পড়লে প্রতিটি বই থেকে আপনি কিছুনা কিছু ইন্সিপিরিশান পেতে পারেন।
০৬. কয়েকটি কারণে ই কমার্স একটু স্পর্শকাতর। কারণ এখানে কেউ যদি আপনার ফেইসবুক ফেইজে একটি নেতিবাচক কমেন্ট করে তার আপনার শত শত গ্রাহক জানবে এতে আপনার সুনাম নষ্ট হবে। কিন্তু এটা যদি মার্কেটের একটা দোকান হতো তাহলে একজন ক্ষিপ্ত কাস্টমার হয়তো মাত্র ১০ জনকে বলতো পারতো। তাই সতর্ক থাকুন। আপনি যদি ব্যবসায়ই করেন তাহলে এখানে ডান বাম করার কোনো সুযোগ নেই।
০৭. আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটা অনেকে গুরুত্ব দেন না। দেখুন আপনি যদি মেইন রোডের পাশে একটা মুদি দোকান দিতেন তাহলে আপনি নিশ্চয় দেখে নিতেন যে ঘরটা উচু এবং মজবুত কিনা? কোথাও পানি পড়ার সম্ভাবনা আছে কিনা? উপরের টিন কেটে রাতে চোর ঢুকতে পারে কিনা? সব মাল ঠিকভাবে রাখা যাবে কিনা? বাইরে থেকে ছিঁচকে চোরেরা কিছু নিয়ে যাবে কিনা? এগুলো যতদিন দোকান করেন ততদিনও খেয়াল রাখেন। সন্ধ্যায় বাসায় যাওয়ার সময় সবকিছু দেখে দরজা জানালা বন্ধ করে ভালো তালা মেরে যান।
মনে রাখবেন আপনার অনলাইন শপটাও একটা ভার্চুয়াল দোকান। এখানেও চোরের অভাব নেই। একেবারে আস্ত দোকানটাই নিয়ে যেতে পারে। সূতরাং আপনাকে আগেই সাইট নিরাত্তার সব বিষয়গুলো দেখে নিতে হবে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে। আপনি যখন সাইন ইন সাইন আউট করবেন তখনে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে কিছু বিষয় অন্যদের কাছ থেকে জেনে নিতে ভুলবেননা।
০৮. দোকানে আপনি কাস্টমারকে নিজ হাতে পন্য দেখান, ভালোমন্দ বলেন। কাস্টমারের কোনো জিজ্ঞাসা বা আশংকা থাকলে আপনি কথা বলে দূর করে দিতে পারেন। কিন্তু অনলাইন শপে সে সুবিধা নেই। তাই যথাসম্ভব তথ্য সাজিয়ে পন্যের সাথে তুলে ধরুন। বর্তমানে অবশ্য একটি কোম্পানী এধরনের একটি সার্ভিস দিয়ে থাকে। যাতে কাস্টমার আপনার সাইটে ঢোকার পর আপনি তার সাথে চ্যাট করতে পারবেন। কোনো কোনো কোম্পানী এধরনের ইএমএস বানায় যাতে আপনার সাইটই আপনাকে বলে দেবে ভবিষ্যতে কি কি ধরনের পন্য বেশী বিক্রি হতে পারে।
০৯. গলির মোড়ে আপনার যখন দোকান থাকে তখন সবাই আপনাকে চিনে বিশ্বাস করে এবং নির্দিধায় পন্য কিনে। পন্যের কোনো সমস্যা হলে আপনাকে পাওয়া যাবে এই ভরসায় থাকে। কিন্তু আপনি যখন অনলাইনে একটি শপ খুলেছেন। তখন ক্রেতার অবিশ্বাস এর একটা জায়গা থাকবেই। এটা সামাল দেয়ার জন্য আপনি বিশ্বাসের জায়গাটা মেরামত করে নিতে পারেন। আপনার ট্রেড লাইসেন্স, টিন, ভ্যাট এসব উল্লেখ করে দিতে পারেন। ঠিকানা ও ফোন নাম্বারতো থাকবেই। সম্ভব হলে একটি টিএন্ডটি নাম্বারও নিতে পারেন। কোনো ক্রেতা বিশ্বস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাকে সেটা মনে করিয়ে দিতে পারেন যে আপনার একটা ঠেলিফোন লাইন আছে। আর ব্যাংক একাউন্ট, ওপিজি, ইনপোর্ট এক্সপোর্ট, ই ক্যাবের সদস্যপদ, স্থানীয় বনিক সমিতির সদস্যপদ এগুলোও রাখতে পারেন।
১০. মার্কেটে দোকান দিলে দোকান খোলা ও বেচাকেনা করার জন্য আপনাকে মার্কেটে যেতে হবে। এখানে মানে ই কমার্সে এই কাজটা আপনাকে অনলাইনে ঢুকে করতে হবে। অবশ্য সেটা আপনি যেকোনো জায়গায় বসে করতে পারবেন। তবে আপনি যদি একাই ব্যবসায়টা চালান তখন কিন্তু দুটো জায়গায় আপনাকে যেতে হবে। ১. পন্যটি যেখানে আছে, সেটা হতেপারে আপনার বাসা, হতে পারে অন্য কারো কাছে। ২. পন্যটি পাঠানোর জন্য আপনাকে কুরিয়ারে যেতে হবে। আজকাল অবশ্য অনেক কুরিয়ার পন্য পিক করে থাকে। আর পেমেন্ট পেতে ব্যাংকে যেতে হবে। বিকাশ একাউন্ট হলেও ক্যাশ করার জন্য কোনো কাউন্টারে যেতে হবে। নিজে রিসিভ করার জন্য গেলেন না অন্যকে পাঠানোর জন্যও যেতে হতে পারে। সব সময় সব মানুষ বিকাশে টাকা নিতে পছন্দ নাও করতে পারে। এসব করার জন্য আপনার অন্য কোনো লোক থাকলে ভিন্ন কথা। আপনি কি খেয়াল করেছেন? পন্যটি হয়তো বিক্রি আপনি আপনার ক্লাসরুসেই বসেই অনলাইনে করেছেন কিন্তু  পাঠাতে ও দাম নিতে আপনাকে কিন্তু কোথায় না কোথায় যেতে হচ্ছে সূতরাং ঘরে বসে থাকলে টাকা এসে পকেটে ভরে যাবে। একথা ভুলে যান। হ্যা টাকা ঘওে আসতেও পারে, যদি আপনি ঘরে বসে এই কাজগুলো সঠিকভাবে সামাল দিতে পারেন। এখন আপনি কি পারবেন আর কি পারবেন না। সেটা আপনারই ভালো জানার কথা।
১১. অনেক বলেন ই কমার্স এ ঘরভাড়া লাগেনা, কারেন্ট বিল লাগেনা কতো সুবিধা! আসলে কি তাই? আপনি যে ওয়েবসাইটটা বানালেন এটা কি প্রতিবছর সাইটের ভাড়া দিচ্ছেন না? কাজ করছেন পিসিতে বিদ্যূৎ বিল আসছেনা? কিন্তু এটা সত্য প্রথাগত ব্যবসায়ের চেয়ে এটা অনেক কম। ঠিক পুরো ব্যবসাটা দাড় করাতে অনেক কম খরচ হয়। এটাই এর সুবিধা কম খরচ মানে কি ২/৪ হাজার টাকায় ই কমার্স করা যাবে? আপনাদের বোঝার জন্য বলছি পার্থক্যটা হচ্ছে যে মানের একটা  দোকান বাস্তবে দিতে ১০ লাখ লাগবে সে মানের একটা দোকান আপনি অনলাইনে ২ লাখ টাকায় দিতে পারবেন। আর ৫০ লাখ টাকার দোকানটা ৭-১০ লাখে দিতে পারবেন। অবশ্য আপনি যদি ব্যবসায়টা ভালো বোঝেন আর একটু কৌশলী হোন হয়তো আপনার পক্ষে আরো কমও লাগতে পারে।
তাই বলছি। ই কমার্সকে কেউ কঠিন আর জটিল বা ঝামেলা মনে করে দূরে সরে যাবেন না। আর কেউ সহজ মনে করে হেলাফেলায় শুরু করবেন না। জানুন, বুঝুন, শিখুন তারপর সিদ্ধান্ত নিন।

1,495 total views, 2 views today

Comments

comments